সোমবার,১ মার্চ, ২০২১ অপরাহ্ন

তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হোক

রিপোর্টারের নাম: আন্দোলন৭১
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২১ ১৭ ২২

তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হলে রাষ্ট্রের সকল স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে। ‘তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা হলে স্বভাবিকভাবেই দুর্নীতি হ্রাস পাবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে। তৃণমূল পর্যায়ে তথ্য অধিকার বিষয়ে সচেতনতা ও উদ্বুদ্ধকরণে কমিউনিটি রেডিওর ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধান তথ্য কমিশনার বলেন, তথ্য অধিকার আইন তথ্য জানার অধিকারকে আইনগত স্বীকৃতি দিয়েছে। একটি অফিসে কি কি কাজ হয়, অফিসটি কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা বা সেবা দিচ্ছে এসব বিষয়ে জানতে এই আইন সহায়তা করছে।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তথ্য অধিকার আইন পাস করে, যা অত্যন্ত কার্যকর ও অগ্রসর একটি আইন। আইনটি জনগণের এবং জনগণ আইনটি ব্যবহার করে তার প্রয়োজনীয় তথ্য বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পেতে পারেন। দেশে এখনো সবার জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সবার তথ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এখনো আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। সারাদেশে তথ্য অধিকার আইনটি ব্যাপক প্রয়োগের মাধ্যমে গণজোয়ার তৈরি করে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। এটি তথ্য কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তথ্য কমিশন ইতোমধ্যেই সারাদেশে প্রশিক্ষণসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।

জনগণের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হলে এ আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। সমাজের সর্বস্তরে তথ্য অধিকার আইনের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। জনগণের জীবনমান উন্নত ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। জনগণের তথ্য জানার আগ্রহ ও প্রয়োজনকে মাথায় রেখে সরকারের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইনের বাস্তবায়ন জরুরি। এজন্য জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। সেই সঙ্গে যারা তথ্য প্রদান করবেন তাদের সুরক্ষার জন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইনের মতো আলাদা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে সবাইকে তথ্য প্রদানের দায়িত্ব নিতে হবে, হয়ত আপনার কাছে এমন তথ্য রয়েছে যা আপনি প্রকাশ না করলে কেউ কোন দিনই জানতে পারবে না। তাই আপনার তথ্য জনস্বার্থে আপনাকেই প্রকাশ করতে হবে।

সময়ের পরিবর্তন হচ্ছে সময়ের নিয়মে। আমরা ইচ্ছে করলেই এই পরিবর্তন ঠেকাতে পারবো না। ঠেকাতে চাইও না। সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে মানুষের জীবনাচার, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ। তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করে তুলছে। আর এই তথ্য প্রবাহের বর্তমান প্রধান উৎস হচ্ছে ইন্টারনেট। এই ইন্টারনেট বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব পুরো পৃথিবীর মানুষকে জড়িয়ে ফেলেছে একটি জালের মধ্যে। এই ইন্টারনেট এর যেমন অবাধ বিচরণ রয়েছে তেমনি সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ভাবে রয়েছে এর নিয়ন্ত্রণও।

তথ্য অবাধ হওয়ার যেমন প্রয়োজনীয়তা আছে তেমনি এর নিয়ন্ত্রণেরও প্রয়োজন আছে বয়স এবং অবস্থান ভেদে। নইলে এর অপব্যবহারের আশংকা রয়ে যায়। ভুল তথ্য মানুষ তথা সমাজ এবং রাষ্ট্রকে নিয়ে যায় ভুল পথে, পরিণামে ক্ষতি বৃদ্ধি হওয়ার সমূহ সম্ভবনা থেকে যায়। সব তথ্য সবার জন্য নয় এই বিষয়টি আমাদের বুঝতে হবে নিজেদের স্বার্থে।


বর্তমান সময়ে শুধু বাংলাদেশ নয় বরং সমস্ত পৃথিবী জুড়ে খুন, রাহাজানি, জঙ্গীবাদ, ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধ বেড়েছে বহুগুনে। অনেকে হয়তো বলবেন, এগুলোকি আগেও ছিল না? ছিল, তবে এইরকম মহামারী আকারে নয়। এখন প্রতিদিনের খবরের কাগজ খুললেই ভালো খবরের তুলনায় এইধরণের খবরের আধিক্যই নজরে আসে।ইন্টারনেটে তরুণ সমাজ এখন সহজেই জেনে যায় সন্ত্রাসের নতুন নতুন কৌশল। অতি সাধারণ জিনিস দিয়ে কিভাবে বোমা বানানো যাবে এই বিষয়টি জানতে যদি একবার গুগলে গিয়ে সার্চ দেন দেখবেন হাজার হাজার লিংক চলে এসেছে আপনার চোখের সামনে। একটি মিথ্যা এবং বানোয়াট তথ্য কোনো রকম যাচাই না করে মানুষকে করে তোলে হিংস্র, শুরু হয় ধর্মীয় এবং জাতিগত বিদ্বেষ-সহিংসতা। যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা নাগরিকগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃত এবং তথ্য প্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যেহেতু জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

যেহেতু জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হইলে সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারী ও বিদেশী অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারী সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাইবে, দুর্নীতি হ্রাস পাইবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হইবে; এবং যেহেতু সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারী ও বিদেশী অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারী সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন। এটি তথ্য কমিশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তথ্য কমিশন ইতোমধ্যেই সারাদেশে প্রশিক্ষণসহ নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। জনগণের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হলে এ আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। সমাজের সর্বস্তরে তথ্য অধিকার আইনের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে।

প্রেসক্লাব সভাপতি মো. সাইফুল আলম বলেন, যখন অগণতান্ত্রিক সরকার আসে, তখনই বলা হয় এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না। তারা অবাধ তথ্য প্রবাহকে ভয় পায়। সেটি তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায়। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার অবাধ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করতে তথ্য অধিকার আইন করেছে। আমরা গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে সবসময়ই চাই, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত হোক। তবে যেসব তথ্য প্রকাশ করলে দেশ, জাতি ও সমাজের ক্ষতির আশংকা থাকে সেসব তথ্য প্রকাশের বিষয়ে বিবেচনা বোধ আমাদের থাকতে হবে। তথ্য জানার অধিকার মানুষের জন্মগত অধিকার। একটি শিশু যখন বোধ লাভ করে তখন থেকেই বাবা, মা কিংবা বড়দের কাছে জানতে চায় এটা কী, ওটা কী? পরে সে বড় হয়ে সমাজ বা দেশের কাছেও তথ্য জানতে চায়। যারা তথ্য দেন তারা যেন কোনো রকম ভয় ছাড়া তথ্য প্রদান করতে পারেন, সেজন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইনের মতো তথ্য প্রদানকারীর সুরক্ষা আইন করা যায় কিনা, বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। কেননা, অনেক সময় তথ্য প্রদানকারী নানা ধরনের চাপের মধ্যে পড়েন।


তথ্যের অবাধ প্রবাহের সঙ্গে গণতন্ত্রের নিবিড় সম্পর্ক একটি সর্বজনস্বীকৃত বিষয়। কার্যকর ও ফলপ্রসূ গণতন্ত্রের জন্য অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্যবিনিময়–ব্যবস্থার অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও তথ্যপ্রবাহ অবাধ হয়নি; বরং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন অংশের পক্ষ থেকে নানা রকমের বাধা আসছে। এই সমস্যা কমবেশি বৈশ্বিক; যেসব মানুষ পৃথিবী, বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তাঁরা এটাকে পুরো মানবজাতির সমস্যা হিসেবে দেখছেন। প্রকৃতপক্ষে তথ্য অধিকারের বিষয়টি ১৯৪৬ সাল থেকেই আলোচিত। জাতিসংঘের মতে 'তথ্যের স্বাধীনতা বা অবাধ প্রবাহ হলো মৌলিক মানবাধিকার এবং জাতিসংঘ প্রদত্ত সকল স্বাধীনতার জন্য পরশপাথর।' বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তনের পর অর্ধযুগ পেরোলেও সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও এ আইনটি সম্পর্কে যথেষ্ট অবহিত নন।

তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দেওয়া এবং তথ্যের চাহিদা সৃষ্টিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকাটি রাখতে পারে গণমাধ্যম। সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম যদি এক হয়ে কাজ করে, তাহলে কেবল তথ্যের চাহিদাই সৃষ্টি হবে না, সেইসঙ্গে তথ্য প্রদানকারীর ওপরও চাপ সৃষ্টি হবে। ফলে তথ্য আদান-প্রদানে নিশ্চিত হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রচারণা ও জনসচেতনতা তৈরির জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়ের কোনো বাড়ির উঠোন পর্যন্ত যে মানুষটি অবাধে বিচরণ করতে পারেন, তিনি হলেন একজন রাজনৈতিক নেতা। তাই তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে প্রচার ও তথ্যের চাহিদা সৃষ্টিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে তথ্যের চাহিদা সৃষ্টি, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ সর্বোপরি সফলভাবে তথ্য অধিকার আইন বাস্তবায়নে মূল ভূমিকা পালন করতে হবে মূলত তথ্য কমিশনকেই। এ জন্য প্রয়োজন একটি কার্যকর, গতিশীল, স্বাধীন ও ক্ষমতাশালী তথ্য কমিশন। একটি সুশাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য ৫৬ শতাংশ নয় বরং শতভাগ মানুষকে ক্ষমতায়ন করতে হবে।

লেখক: সাব্বির আহমেদ, শিক্ষার্থী-জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin