মঙ্গলবার,১১ মে, ২০২১ অপরাহ্ন

এক ফরাসি বীর কন্যার গল্প

রিপোর্টারের নাম: আন্দোলন৭১
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২১ ২১ ৪২
ছবি-সংগৃহীত

জান্নাত আফরিন-

দিনটি ছিল ১৪৩১ সালের ৩০ মে। চারপাশে বিরাজ করছিল থমথমে পরিবেশ। শোনা যাচ্ছিল একটি মেয়ের হৃদয়বিদারক চিৎকার। যার আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চারপাশ, সে মেয়ে আর কেউ নয় তিনি হলেন জোয়ান অব আর্ক। তার সাহসিকতার জন্য তাকে “ ফ্রান্সের হিরোইন জোয়ান অব আর্ক” বলা হয়। সেদিন যেন আর্তনাদের উৎসবে মেতে উঠছিল ইংলিশরা। মেয়েটির প্রতিটি চিৎকার যেন ইংলিশদের সফলতার আগাম দিচ্ছিলো । সীন নদীর পাশে ফ্রান্সের একটি গ্রামে উঁচু পিলারের সাথে বেধে আগুনে পোড়ানো হয়েছিল তাকে। একাবার পুড়িয়ে যেন কোন ক্রমেই পরিতৃপ্তি লাভ করতে পারলেন না ইংরেজরা। তাই তাকে আবারো পোড়ানো হল। তাতেও যেন তৃপ্তি মিললো না। তৃতীয়বারের মতো পোড়ানো হল তাকে। তৃতীয়বারে তার পুরো দেহ পুড়ে ছাইয়ে পরিনত হলো। এইবার এই ছাই বির্সজন করা হলো সীন নদীতে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ১৯ বছরের মেয়টিকে কেন এমন নির্মম ভাবে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হলো? কে ছিলো এই বীরকন্যা জোয়ান অব আর্ক?

জোয়ান ছিল সুন্দরী এবং তেজী একটি মেয়ে। তার চেহারায় জলমল করতে সেই তেজ। ফ্রান্সের একটি গ্রাম ডমরেমিতে ১৪১২ সালের ৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন জোয়ান অব আর্ক। তার বাবা জাক দ্য আর্ক। পেশায় তিনি ছিলেন একজন সামান্য কৃষক। মা ইসাবেল রোমিই ছিলেন একজন গৃহীনি। ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করায় খুব ধার্মিকভাবে কেটেছে জোয়াররের ছেলেবেলা। বাবার ছোট গবাদিপশুর খামারে গবাদিপশুর সাথে খেলতে খেলতেই কেটে যেত জোয়ারের সময়। শোনা যায় যে, জোয়ারের বয়স যখন ১২ বছর তখন একদিন মাঠে ভেরা চরানোর সময় এক অলৌকিক বাণী শুনতে পায় সে। প্রভুর ফেরেস্তারা তাকে বলে যায় একমাত্র সেই পারবে তার মাতৃভূমি ফ্রান্সকে মুক্ত করতে এবং ফ্রান্সে যোগ্য রাজার শাসন প্রতিষ্ঠা করতে।

জোয়ান মনে-প্রানে বিশ্বাস করতে লাগেন সেই পারবে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করতে। তার হাতেই লিখা আছে জন্মভূমির স্বাধীনতা। নাহলে প্রভু এতো মানুষের মধ্যে তাকেই কেন নির্বাচন করলেন। এই দৈববাণী যেন জোয়ানের জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেয়। তৎকালীন ফ্রান্সের অবস্থা ছিল খুবই করুন। ১৩৩৭ সালে ফ্রান্সের সিংহাসন জোর করে দখল করে নেন ইংল্যান্ড রাজা তৃতীয় এডওর্য়াড। যার কারনে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে শুরু হয় যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বিগ্রহে ফরাসিরা বারবার পরাজিত হয়। ১৪১৫ সালে এক যুদ্ধে ফ্রান্সকে পরাজিত করে ফ্রান্সে শাসন প্রতিষ্ঠা করেন

ইংল্যান্ড রাজা পঞ্চম হেনরি। এই যুদ্ধের সমাপ্তির সাথেই ধীরে ধীরে ভাঙতে শুরু করে ফ্রান্স। সেই সময় ফ্রান্সে ঐক্যর বড়ই অভাভ ছিল। তৎকালীন ফ্রান্সের রাজা ছিলেন চার্লস। যার শাসনব্যাবস্থা ছিল দুর্বল। সেই সময় অর্থাৎ ১৪২৭ সালে জোয়ান রাজা চার্লসের সেনা কামান্ডারের সাথে দেখা করতে যায়। এবং তাকে জানান তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে চায়। জোয়ানের মুখে এই কথা শুনে রর্বাট রড্রিকট রাগান্বিত হয়ে বলেন কে আছো এই মেয়েকে তার বাড়ি দিয়ে এসো আর তার বাবাকে বলবে তাকে যেন বেত আঘাত করা হয়। কস্ট নিয়ে বাড়ি ফেরার আগে জোয়ান ভবিষ্যৎবাণী করে অর্লিনসের বিপক্ষে ফরাসীরা পরাজিত হবে। এবং ঘটেও তাই। এই ঘটনা যেন জোয়ানের মনোবল আরো শক্ত করে দেয়।

যুদ্ধে হারার পর রর্বাট জোয়ানের কথা মনে করে আশ্চর্য হন। পরবর্তীতে তিনি জোয়ানকে রাজা চার্লসের সাথে দেখা করায়। কিন্তু শর্ত ছিল তাকে তার চুল কেটে ছোট করতে হবে এবং পরতে হবে ছেলেদের পোশাক। জোয়ান তাই করে। প্রশিক্ষণের পর জোয়ান রাজার কাছে যুদ্ধে যাওয়ার আদেশ চায়। চার্লস তাকে অনুমতি দেয়। অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথেই ঘোড়ায় শোয়ার হয়ে বেরিয়ে পরে যুদ্ধের জন্য। ১৬ বছরের সাহসী কিশোরী জোয়ান অব আর্ক! সাথে তার চার হাজার ফ্রেঞ্চ সৈন্য। জোয়ান তার সাহসিকতা এবং দূরদর্শীতার মাধ্যমে একের পর এক দূগ জয় করতে

থাকে। মে মাসে ইংল্যান্ডের দখল করা লে তুরেল দূগ জয় করার অভিযান চালায় জোয়ান। ঐ যুদ্ধে আহত হয় তিনি। একটি তীর এসে লাগে তার কাধে। সেই তীরের ক্ষত দমাতে পারেনি তেজি জোয়ানকে। আঘাত পাওয়ার পরেও যুদ্ধে এগোতে থাকে জোয়ান। তার এই সাহসিকতা যেন ফ্রেঞ্চ সেনাদের মনে নতুন মনোবল তৈরী করে। নতুন শক্তিতে ফ্রেঞ্চ সেনারা ঝাপিয়ে পরে ইংরেজদের উপর। ছিনিয়ে আনে বিজয়। হেরে যায় ইংল্যান্ড। অসাধারন এই জয়ের পর জোয়ানের পরবর্তী নজর ছিল রেইমস নগর। এইবারও জোয়ানের ঝুলিতে চলে আসে রেইমস নগর। ঠিক তার পরের দিন ফ্রান্সের রাজা অর্থাৎ “ভবিষ্যৎ রাজা” চার্লসের অভিষেক করে তাকে মুকুট পরানো হয়।

১৭ জুলাই ফ্রান্স পায় তাদের রাজা “সপ্তম চার্লস” কে। অভিষেকের মুহূর্তেও জোয়ান যেন তার পাশে ঢালের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। রাজার অভিষেকের সাথে সাথে সম্পুর্ন ফ্রান্সে ছড়িয়ে পরলো জোয়ানের সাহসিকতার গল্প। জোয়ানের সবথেকে বড় পরিকল্পনা ছিল ইংরেজদের থেকে প্যারিস মুক্ত করা। ৮-ই সেপ্টেম্বর জোয়ান একটি সৈন্য দল নিয়ে বেরিয়ে পরলো প্যারিস অভিযানে। সেদিন যুদ্ধে জোয়ান আবার আহত হলো। একটি ক্রসবো এসে আঘাত করলো তাকে। আহত জোয়ান থামেনি। জোয়ানের চোখে মুখে ছিল প্যারিস জয়ের নেশা। নির্ভয়ে যুদ্ধ

চালিয়ে যেতে লাগে জোয়ান। ইতিমধ্যে ক্যাম্পিন শহর দখল করে ফেলে বার্গান্ডিয়ানরা। জোয়ান কোন ভাবেই বসে থাকতে পারেনা। ছোট সৈন্যদল নিয়ে চলে যায় ক্যাম্পিন মুক্তি উদেশ্য। তখন কিছু নামধারী ধর্ম ব্যাবসায়ী রাজা চার্লসকে জোয়ানের বিরুদ্ধে করে তোলে। রাজা চার্লস ক্ষিপ্ত হয়ে জোয়ানকে যুদ্ধ বন্ধ করে ফিরে আসার আদেশ পাঠান। কিন্তু জেদি জোয়ান যুদ্ধ বন্ধ করতে নারাজ। রাজার আদেশের বিরুদ্ধে যেয়ে সে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ইংরেজরা যখন জানতে পারে জোয়ান রাজার মতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে তখন তারা জোয়ানের পরাজয়ের পরিকল্পনা শুরু করেন।

আর যার কারনে বার্গান্ডিয়ানদের ষড়যন্ত্রে ধরা পরে যায় জেয়ান অব আর্ক। তারা জোয়ানকে জেলে বন্ধি করে রাখে। জোয়ান জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করে তাও একবার নয় বারবার। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয় সে। জোয়ান যেন আর পালানোর চেষ্টা না করতে পারে তাই তাকে রাখা হয় একটি টাওয়ারে। যেটির উচ্চতা ছিল প্রায় ৭০ ফুট। কিন্তু সেই উচ্চতা যেন কিছুই ছিলোনা জোয়ানের জন্য। সেখান থেকেও পালানোর চেষ্টা করে সে। ঝাপিয়ে পরে ৭০ ফুট উঁচু টাওয়ার থেকে। নিচে পানিপূর্ন পরিখা থাকায় বেচে যায় সে। জোয়ান বেচে গেলেও চলার মত সুস্থ সে ছিলোনা। জ্ঞান হারায় জোয়ান। জ্ঞান ফেরার পর তার আর বুঝতে বাকি

থাকেনা, তাকে ১০ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে ইংরেজদের কাছে। ইংরেজরা জোয়ানকে দেখার পর কোন ভাবেই মানতে পারে না এই কিশোরী তাদের এতো বড় বড় পরাজয়ের কারন! তখনকার মানুষরা ছিল কুসংস্কারচ্ছন্ন। জোয়ানের ভবিষ্যৎবাণী সত্য হয়ায় সবাই তাকে ডাইনি ভাবতে থাকে। ইংরেজরাও সুযোগের সঠিক ব্যবহার করে এবং জোয়ানকে ডাইনি হিসেবে প্রমান করতে চায়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে জোয়ানের সব যুদ্ধে তার শক্ত মনোবলের পেছনে ছিল তার ধর্মীয় চেতনা। ইংরেজরা ছড়িয়ে দিতে লাগলো জোয়ান ডাইনিবিদ্যা চর্চা করে আর এই যাদুর মাধ্যমেই সে ইংরেজদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছে। সবাই তাই বিশ্বাস করলো। কালো যাদু ছিল ধর্ম বিরোধী।

আর যারা ধর্মের অবমাননা করে তাদের জন্য ছিল সর্বোচ্চ শাস্তি। জোয়ানকে ফাসিঁ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। যে রাজা চার্লস জোয়ানের মাধ্যমে তার রাজত্ব পেয়েছিল সে জোয়ানের মুক্তির জন্য কিছুই করলেন না। বড় অসহায় বোধ করতে লাগলো জোয়ান। ঠিক তখন ইংলিশ চার্চ জোয়ানকে কথা দিলেন সে যদি নারী পোশাকে চার্চে কনফেশন দেয় তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। জোয়ান রাজি হয় এবং চার্চে কনফেশনর জন্য যায়। কিন্তু সবই ছিলো মিথ্যা ষড়যন্ত্র। সেটা বুঝতে পেরে জোয়ান চার্চ পরিত্যাগ করে এবং

তার যুদ্ধের পোশাক পরিধান করে নেন। চার্চের অপমানে দায়ে তাকে মৃত্যুদন্ডের নির্দেশ দেওয়া হলো। আর ডাইনি অপবাদে তাকে পুড়িয়ে মারা পরিকল্পনা করা হলো। ১৪৩১ সালের ৩০ মে সীন নদীর পারে রোঁয়ার বাজারে জনসম্মুখে একবার নয় তিন তিন বার পোড়ানো হয় ১৯ বছরের জোয়ান অব আর্ক কে। মৃত্যুর পর তার দেহাবশেষের ছাই সীন নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

সেই ঘটনার ঠিক ২৫ বছর পর পপ ক্যানিক্সটাস-৩ প্রামান করতে সক্ষম হন যে এটি একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ছিল। আর ঘোষনা করা হয় জোয়ান নিষ্পাপ ছিল। সব ষড়যন্ত্র মানুষের সামনে প্রকাশ পায় এবং জোয়ানকে শহীদের মর্যাদা প্রদান করা হয়। এরপর ক্যাথলিক চার্চ তার ৫০০ বছর পর জোয়ানকে “সেইন্ট” খেতাব দেয়। আরো বলেন কিশোরী জোয়ান অব আর্ক একজন সেইন্ট ছিলেন। এরপর থেকে ক্যাথলিকরা ৩০ মে জোয়ানের মৃত্যুদিবস শ্রদ্ধার সাথে পালন করেন। যেই সাহসী জোয়ানকে একসময় ডাইনি, ধর্মবিরোধী বলে মিথ্যা অপবাদে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় সেই জোয়ানকে, সে এখন ফ্রান্সের বীরকন্যা “দি জোয়ান অব আর্ক”। যার

অবদান সবসময় মনে রাখবে ফ্রান্স। ইতিহাসে পাতায় যার নাম সদা স্মরণীয় হয়ে থাকবে সে হলেন “ফ্রান্সের হিরোইন জোয়ান অব আর্ক”।

আন্দোলন৭১/হাবিব

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin