শনিবার,৬ জুন, ২০২০ অপরাহ্ন

করোনা প্রতিরোধে তরুণদের অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ০৪ এপ্রিল, ২০২০ ০৬ ০৬

আফতাব হোসেন-

চায়ের কাপে ঝড় তোলার জন্য যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা অথবা ভারত-পাকিস্তানের খেলা একটি মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে, সেখানে বিশ্বকে হতাশার চাঁদরে আবৃত করে ফেলা করোনা ভাইরাস কেন চায়ের কাপে ঝড় তুলতে ব্যর্থ? কারন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা স্বেচ্ছাবন্দী জীবন আমাদের সে সুযোগটি আর দিচ্ছেনা।

এই ঘরে বসে থাকার সময়টাতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আমাদের তরুণরা এগিয়ে এসেছে আলস্যের চাদর ছিড়ে। দেশের পত্রপত্রিকা গুলোর মাধ্যমে আমরা দেশ থেকে দূরে বসে জানতে পারছি কি কি হচ্ছে সেখানে। আর সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেশের বাইরে অবস্থান করেও কখনো মনে হয়নি দেশের বাইরে আছি। সকল খবরাখবর যেন মুঠোবন্দী তর্জনীর এক খোঁচাতেই । করোনা প্রতিরোধে তরুণদের অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয়।

পড়ার টেবিল থেকেও জানতে পারছি দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং তরুণদের এগিয়ে আসার বিজয়গাঁথা। ভাবতে গর্ববোধ করি এই তরুণদের এগিয়ে আসার নামই বাংলাদেশ, আমার জন্মভুমি। 

যেখানে তরুণরা ঘরে বসে সরকার এবং ব্যবস্থাপনার সাফল্য বা ব্যর্থতার গল্পগাথা নয় বরং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কি সুন্দর ভাবেই না তৈরি করছে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাজীবিদের জন্য ব্যাক্তিগত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা পিপিই। কখনো বা চাঁদা তুলে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে ক্ষুধার্থ পরিবারের দোরগোড়ায়। পিছিয়ে নেই তারা সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্রেও। বরং উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারবো বাংলাদেশের তরুণদের কথা। আমরা যারা একাত্তর দেখিনি তারা দেখতে পাচ্ছি সতর্কতার সাথে ভয় ডরকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের বিপদে কীভাবে এগিয়ে আসছে তারুণ্যশক্তি।

তবে আলোর নীচে যেমন কিছুটা অন্ধকার থাকে, তেমনি আমাদের মধ্যেই অনেক অতি উৎসাহী তরুণ এখনো চায়ের কাপে ঝড় তোলার অভ্যাসটা থেকে ঠিক বেরিয়ে আসতে পারছেনা বলেই মনে হয়! যেখানে একদল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে মানুষের জন্য, সেখানে আরেকদলের এদিক-সেদিক চায়ের দোকানে ঘুরে বেড়ানোটা ঠিক এক হাড়ি দুধের মধ্যে একফোঁটা লেবুর রসের মতোই। এর কারণ হিসেবে দায়ভার কার? এর দায়ভার নিতে হবে আমাদের নিজেদেরকে যার যার জায়গা থেকে।

প্রথমত, আমরা হয়তো আমাদের সবাইকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বা ‘সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং’ এবং ‘স্বেচ্ছা সঙ্গরোধ’ বা ‘সেলফ কোয়ারেন্টাইন’ এর সঠিক বিষয়টি বুঝাতে ব্যর্থ।

দ্বিতীয়ত, যথাযথ জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার দরুণ অতি উৎসাহী মনোভাব। আমাদের বুঝতে হবে, সামাজিক দুরত্বের অর্থ সমাজ থেকে দূরে থাকা। হ্যাঁ, সামাজিক মেলামেশার বিষয় আমরা সবাই জানি এবং বুঝি। তাহলে কেন মানতে পারছিনা? সহজ উত্তর, ‘আমার বন্ধুর করোনা নেই’। হ্যাঁ হতে পারে, কিন্তু যেখানে আড্ডা দিচ্ছি জায়গাটি কী ভাইরাস মুক্ত?

বিবিসি এর সূত্রমতে, কোভিড-১৯ বা করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, যার আকার এক থেকে পাঁচ মাইক্রোমিটার বা একজন মানুষের চুলের প্রস্থ্যের ৩০ ভাগের এক ভাগের সমান বা আরও ক্ষুদ্র। চায়ের দোকানের কাঠের বেঞ্চ বা চেয়ারের ওপর এটি বেঁচে থাকতে পারে ২৪ ঘন্টা থেকে তিনদিন পর্যন্ত। আর চায়ের কাপ বা কাঁচের জিনিস, যেকোনো ধাতব বস্তু এবং প্লাস্টিক দ্রব্যের ওপর এটি বেঁচে থাকে নয়দিন পর্যন্ত। তাহলে আমরা কিভাবে জানবো কোন আক্রান্ত ব্যক্তি সেখানে বিগত দিনগুলোতে অবস্থান করেনি? আর এই ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হল অনেকেই এই ভাইরাসের বাহক হলেও প্রায় অর্ধেক মানুষের ক্ষেত্রেই জ্বর বা অন্যকোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়না।

আরেকটি যুক্তি হলো, এই ভাইরাসে তরুণদের তুলনায় প্রবীনদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। হ্যাঁ, যুক্তির খাতিরে কথাটি মেনে নিলেও এখানে মুখ্য বিষয় হচ্ছে আমাদের বাড়িতে বা আশেপাশে থাকা প্রবীন এবং বয়স্কদের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আমার কারণে অন্য আরেকজন আক্রান্ত হলে তার পরিনতির দায়ভার কিন্তু আমারই। তাই এধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ত্যাগ করতে হবে সর্বোপরি।

আরেকটি বিষয় নিয়ে না বললেই নয়। আমাদের বাড়িতে বা পরিবারে প্রায় সবারই কিছু প্রবীণ এবং বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য বিদ্যমান। তাঁদেরকে সচেতন করা আমাদের জন্য জরুরী এবং দায়িত্ব। কিন্তু তাঁদেরকে বারবার বয়সের কারণে তাঁদের ঝুঁকিপুর্ণ অবস্থান নিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়াটা হতে পারে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আর এই কাজগুলো করতে উদ্যোগী ভুমিকা নিতে হবে আমাদের তরুণ সমাজকেই।

তারুণ্যের দেশ বাংলাদেশকে পৃথিবীর অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে দেখার অন্যতম কারণ আমাদের যুবশক্তি। আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা হচ্ছে যুবক এবং তরুণ যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ ভাগ। তাই এদেশের দায়িত্ব এখন তরুণদের হাতেই। একটি দেশ ভবিষ্যতে কোনদিকে যাবে এর পেছনে যেমন সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকে ঠিক তেমনি থাকে সেদেশের তরুণদের ভুমিকা। আর তারুণ্য মশালের বিচ্ছুরণেই যবনিকাপাত হোক সকল অশুভ শক্তি।

লেখক-জ্যোষ্ঠ প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ  

এবং পিএইচডি ফেলো, স্কুল অফ কমিউনিকেশন, ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স মালয়েশিয়া।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin