শুক্রবার,১০ জুলাই, ২০২০ অপরাহ্ন

নেতার সন্তুষ্টি অর্জনে তোষামোদী সাংবাদিকতা?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৪ মে, ২০২০ ২০ ৩২

গোফরান পলাশ-

গণমাধ্যমকে সমাজের দর্পন বা আয়না বলা হয়। আর সাংবাদিকতা হচ্ছে যা তাই। সংবাদ মানে যা ঘটেছে হুবহু তাই। এতে একটু বেশি দাড়ি, কমা কিংবা সেমিক্লোন যুক্ত করার সুযোগ নেই। প্রিন্ট, আনলাইন নিউজপোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় যেভাবেই তথ্য উপস্থাপন করা হোক তা হবে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ। এর ব্যত্যয় হলেই হবে পক্ষপাত দুষ্ট। যার সত্যতা একদিন প্রকাশ পাবেই। কেননা পাঠক এখন খবরের কাগজের চেয়ে ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বেশী খবর শোনে, পড়ে এবং খবরের নেপথ্যের খবর খোঁজে। তবে কেন এই অতিরঞ্জিত কথন? নেতার সন্তুষ্টি অর্জনে তোষামোদী সাংবাদিকতা?

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা আড়াই লাখ জনসাধারন অধ্যুষিত একটি উপজেলা। যার অন্তত: শতকরা ২৪ ভাগ মানুষ বসবাস করে দারিদ্র্য সীমার নীচে। এটি শতভাগ কৃষি নির্ভর অর্থনীতির হলেও এর সাথে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে পর্যটন, মৎস্য, সমুদ্র বন্দর, সাবমেরিন ইন্টারনেট প্রযুক্তি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানী অর্থনীতি। তবে সুশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের অনেক কমতি রয়েছে এখনও ।

আর ভয়াল সিডর, আয়লা, মোহাসেন, বুলবুল, আম্পান এর মত প্রকৃতির রুদ্ররোষ মানুষকে সংগ্রাম করে বাঁচতে শিখিয়েছে এ জনপদে। এছাড়া ভাঙ্গা বেড়িবাঁধ দিয়ে অন্ধারমানিক, রামনাবাদ, শিববাড়িয়া, সোনাতলা, দোন নদীর পানি ঢুকে যখন ফসলী জমি, বাড়ি-ঘর, মাছের পুকুর-ঘের তলিয়ে মানুষকে অসহায় করে তোলে মানুষ তখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতিচ্ছবি দেখে থৈ থৈ পানিতে।

মানুষ কৃষি কাজ করতে গিয়ে ফসলী ক্ষেতে খালের পানি তুলতে নেতার স্লুইজ বিক্রি দেখে, মাছ ধরতে গিয়ে নদী-সমুদ্র বেঁচা কেনা প্রত্যক্ষ করে কিংবা অভাবী সংসারের শিক্ষিত বেকার যুবকের চাকুরীর জন্য জমি বিক্রির টাকা নেতার হাতে তুলে দিয়ে চাকরি নামের সোনার হরিনের পিছু ছোঁটে তখন বুঝতে পারে নেতার আদর্শ। এছাড়া সরকারি জমিসহ সাধারনের জমি, ঘের দখল প্রত্যক্ষ করে তখন বুঝতে পারে নেতার স্বরুপ। এনিয়ে যেন সংবাদ কর্মীদের কোন মাথা ব্যথা নেই। কোন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নেই।

এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিধি মেনে মাসের পর মাস লকডাউনে থেকে এবং ঘুর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডবে নিম্ন আয়ের মানুষ যখন অসহায় তখন সেসব দুস্থ মানুষকে লাইনে দাড় করিয়ে জনপ্রতি একের পর এক ছবি তুলে চলছে নেতার ত্রাণ বিতরণ। দুস্থদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ যেন মুখ্য নয়, ছবি তোলা এবং ফটোসেশনই যেন মুখ্য।

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠনের ক’নেতাসহ মূল দলের ক’নেতার দুস্থদের নিয়ে ত্রাণ বিতরণের এমন ছবি তাদের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এমনকি নেতা বাস্তবে ১০০ মানুষকে ত্রাণ বিতরণ করলে নেতার অনুসারী সাংবাদিকরা তাদের ক্যানভাসে এক হাজার মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণের তথ্য উপস্থাপন করছে।

সেই সাথে নেতার ছাত্র রাজনীতি, বর্তমান-অতীত ও ভবিষ্যতে মানুষের পাশে দাড়ানোর অঙ্গীকার মূলক অতিকথন প্রকাশ করছে। যা মুহুর্মুহু ছড়িয়ে দিচ্ছে নিজেদের, নেতার ও অনুসারীদের ফেসবুক আইডিতে ট্যাগ দিয়ে। সংবাদ যেন যা ঘটে তা নয়। বরং পুরোপুরি উল্টো। জনস্বার্থে নয়, এযেন নেতার সন্তুষ্টিতে সাংবাদিকতা।

যদিও এই নেতাদের সাথে বঙ্গবন্ধু ও মাওলানা ভাসানীর যেন যোজন যোজন ফারাক। বিস্তর ফারাক পরিলক্ষিত হচ্ছে শেখ হাসিনার রাজনীতি, উন্নয়ন ও দর্শনের সাথে। আর এসব নেতার দর্শন জনসাধারনের নয় নিজের, পরিবারের ও অনুসারীদের উন্নয়ন। যে আদর্শ ও মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে এরা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী ভিজিডি, ভিজিএফ, খাদ্য বান্ধব কর্মসূচীর ওএমএস, রেশন কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নগদ সুবিধা প্রাপ্তির তালিকায় প্রকৃত দুস্থদের বাদ দিয়ে পরিবারের সদস্য, দলের নেতা-কর্মী ও অনুসারীদের নাম অন্তর্ভূক্ত করে সরকারের মহতী উদ্দোগ বাঁধাগ্রস্ত করছে।

ভিজিডি, ভিজিএফের চাল চুরি করে কালো বাজারে বিক্রি করছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচীর ডিলাররা ভুয়া কার্ডে দীর্ঘদিন শত শত টন চাল আত্মসাত করে চললেও এ নিয়ে কোন সংবাদ নেই তাদের ক্যানভাসে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের নামে সরকারের টাকা চুরি কিংবা অত্মসাত হলেও তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই এনিয়ে। কৃষি, শিক্ষা, সমাজসেবা, যুবউন্নয়ন, মৎস্য ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের যথাযথ বাস্তবায়ন ও জনসাধারনের উপযোগীতা নিয়েও তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

শুধু মাত্র নেতার কথন, উন্নয়ন দর্শন, ভবিষ্যত পরিকল্পনা লিখে ও নামমাত্র ত্রাণ বিতরণকে হাজার হাজার মানুষের মাঝে ত্রান বিতরন বলে ছবিসহ তথ্য উপস্থাপন করা এখন প্রতিযোগীতা হয়ে দাড়িয়েছে এদের নিজেদের মধ্যে।

উপজেলার ১২ইউনিয়ন ও দু’পৌরসভায় এখন সংবাদকর্মী রয়েছে কয়েক’শ। সাংবাদিক সংগঠন রয়েছে প্রায় ডজন খানেক। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি পকেটে আইডি কার্ড ঝুলিয়ে এরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অফিস পাড়া ও শহর থেকে গ্রামীন জনপদ। এদের মধ্যে স্নাতকোত্তর, স্নাতক ডিগ্রীধারী শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা সাংবাদিকতা বিষয়ে ডিগ্রী বা প্রশিক্ষন না থাকলেও অন্যের লেখা কাট, কপি, পেষ্ট করে এরা দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকতা।

কেউ কেউ বড় মাছ কিংবা খাম নিয়ে তার মিডিয়া কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করে আসার গল্পও ছাড়েন। এরপর সাংবাদিক হয়ে দিব্যি চলছেন। চলবেন আগামী দিনেও। নেতার সন্তুষ্টি অর্জনে ক্যামেরা নিয়ে পিছু ছুটে সকাল সন্ধ্যা প্রটোকল দিচ্ছেন। থাকবেন যখন যে নেতা আসে তার সন্তুষ্টি অর্জনে এক হাতে তেল ও অপর হাতে ক্যামেরা নিয়ে।

করোনা ও আম্পানের প্রভাবে ক্ষতিগস্ত মানুষের এবারের ঈদ উদযাপন নিয়ে তাদের ক্যানভাসে সহমর্মিতার একটি শব্দও নেই। শুধু নেতার সন্তুষ্টি অর্জনে তোষামোদী সাংবাদিকতা?

লেখক: প্রতিনিধি; পটুয়াখালী জেলা, আন্দোলন৭১ নিউজ।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin