মঙ্গলবার,১১ আগস্ট, ২০২০ অপরাহ্ন

জোট আমলে রক্তাক্ত জনপদের শান্তির দূত ইসরা‌ফিল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২০ ১২ ৪২

নাজমুল হক নাহিদ, নওগাঁ থেকে-

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ বলেছেন, সংসদে সবসময় খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরতেন তিনি। তার মৃত্যুতে দেশ একজন প্রতিশ্রুতিশীল ও নিবেদিত প্রাণ রাজনৈতিক নেতাকে হারালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আজীবন দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে গেছেন তিনি।

এই সংসদ সদস্য নিজ এলাকায় শান্তির বাহক হিসেবে পরিচিত। তার নির্বাচনী এলাকা এক সময় রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেখানে শান্তি ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তিনি।

বলছি, নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আস‌নের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক মো: ইসরা‌ফিল আলমের কথা। সোমবার (২৭ জুলাই) তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতা‌লে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা গেছেন।

ইসরাফিল এলাকার মানুষদের শান্তির কথা ভেবে নিজ সংসার, স্ত্রী ও সন্তানদের ভুলে থাকতেন জানিয়ে তার স্ত্রী বলেন, ইসরাফিল আত্রাই-রাণীনগর উপজেলার মানুষদের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে এই অঞ্চলের মানুষদের সুখ আর শান্তির দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। দীর্ঘসময় তিনি এই অঞ্চলের মানুষদের সুখে দুঃখে পাশে থেকেছেন। নিজের এলাকার মানুষদের শান্তির কথা ভেবে তিনি সংসার, নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের ভুলে থাকতেন।

মাত্র ৫৩ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া এই সাংসদের সহধর্মিনী সুলতানা পারভীন বিউটি। ইসরাফিলের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। 

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়,  ফুসফুস ইনফেকশনে আক্রান্ত হ‌য়ে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে  লাইফ সাপোর্টে রাখেন। 

স্ত্রী সুলতানা পারভীন জানান, গত ৬ জুলাই অসুস্থতা নিয়ে তিনি প্রথম এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তখন তার করোনা ধরা পড়ে। এখানে কিছু দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি বাড়ি চলে যান। পরে পরীক্ষা করে করোনা নেগেটিভ আসে। এ অবস্থায় গত ১৭ জুলাই আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাত ১১টা দিকে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেয়া হয়।

তিনি বলেন, বাসায় আনার পর ১৭ জুলাই তার কাশির সঙ্গে রক্ত আসে। ওই দিন আমরা তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করি। এছাড়া তিনি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন।

একসময় রক্তাক্ত জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল নওগাঁ জেলার রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলা। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় সর্বহারারা দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে এই জনপদে মানুষকে জবাই করে রাখতো। এরপর জেএমবির তাণ্ডব। অশান্তি আর হাহাকারের বাতাস বইতে শুরু করে এই অঞ্চলে। ঠিক তখনই আর্বিভাব ঘটে শ্রমিক নেতা ইসরাফিল আলমের।

২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমে তার পরাজয় হয়। এরপর সর্বহারা ও জেএমবির অত্যাচার মাত্রাতরিক্ত আকারে বেড়ে যায়। তখন এই অঞ্চলের মানুষ ৩৬ বছর পর প্রথম আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থীকে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করে। ২০০৮ সালে ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী আলমগীর কবিরকে পরাজিত করে বিএনপির দূর্গ হিসেবে খ্যাত নওগাঁ-৬ আসনটিতে নৌকার প্রার্থী শ্রমিক নেতা মো: ইসরাফিল আলমকে বিজয়ী করেন। এরপর ২০১৮ সালেও তিনি সেই আলমগীর কবীরকে পরাজিত করে তৃতীয় বারের মতো সাংসদ নির্বাচিত হন।

স্থানীয়রা মনে করেন, এক সময়ের শ্রমীক লীগ নেতা ও সংসদে খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়ে সবসময় সোচ্চার থাকা ইসরাফিল তার দেওয়া কথা রেখেছেন। এলাকার প্রতিনিধি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় এই রক্তাক্ত জনপদ থেকে জবাই, হানাহানি, লুণ্ঠন, ছেলে ও স্বামী হারানোর কান্না থেকে রক্ষা করেছেন রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার মানুষকে। বর্তমানে তার চৌকশ নেতৃত্বের কারণে এই অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইছে। যার কারণে এই অঞ্চলের মানুষ কখনই তার বিকল্প খুঁজতে চাননি।

এলাকার মানুষের শান্তির জন্য নিজ পরিবার ত্যাগ করে কাজ করতেন জানিয়ে স্ত্রী সুলতানা পারভীন বলেন, করোনা ভাইরাসের এই সংকটময় সময়ে তিনি পরিবারকে ত্যাগ করে দীর্ঘ প্রায় ৩ মাস এসে রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলার মানুষদের পাশে থেকেছেন।  তিনি এই সময়জুড়ে এলাকার মানুষের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই।

স্বামীর জন্য দোয়া চেয়ে তিনি আরও বলেন, আমাদের সকলকে কাঁদিয়ে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। আপনারা আমার স্বামীর জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন যেন আল্লাহ তাকে মাফ করে ক্ষমা করে দেন এবং জান্নাতবাসী করেন।

নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রাণীনগর) আসনে টানা তিনবার আওয়ামী লীগের সাংসদ হিসেবে নেতৃত্ব প্রদান করছেন তিনি

১৯৬৭ সালে এই ক্ষনজন্মা ব্যক্তির জন্ম। রাণীনগর উপজেলার গোনা ইউনিয়নের ঝিনা গ্রামে মরহুম আজিজুর রহমানের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তিতাস গ্যাস কোম্পানিতে মিটার রিডার হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন চাকরি করেছেন। তার রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু প্রয়াত আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি একসময় ঢাকা মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে পুরোপুরি রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন ইসরাফিল। মৃত্যুকাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় ফেডারেশনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।

ইসরাফিল আলম অনেক গুনে গুনান্বিত। তিনি বর্তমানে টকশোর জগতে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। এছাড়া তিনি একজন তারকা কণ্ঠশিল্পী ও লেখক।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin