শনিবার,৬ জুন, ২০২০ অপরাহ্ন

প্লেগ থেকে কোভিড-১৯, মুক্তি কোথায়?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২০ ০৬ ৩৯

এ, এস, এম সাইফুল্লাহ-

মানব সভ্যতার ইতিহাসে মহামারী নতুন কোনো বিষয় নয়। সভ্যতার বিভিন্ন সময়ে মানুষ বিভিন্ন মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে। কলেরা, বুবোনিক প্লেগ, গুটি বসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা বহু লোকের মৃত্যুর কারন হয়ে দাড়িয়েছে। বলাচলে, ১২ হাজার বছরকাল ধরে সারা বিশ্বে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী এসব মহামারী। সৃষ্টির শুরু থেকেই বলা চলে মানুষ বিভিন্ন রোগ ও নানাবিধ অসুস্থতায় জর্জড়িত হয়ে আছে। তবে সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে  মানুষ কৃষি, বানিজ্য সহ নানাবিধ কাজে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গমনাগমন শুরু করলে এসব রোগ এর  বিস্তৃতি বেড়ে যায়। মানুষ ও অন্যান্য প্রানীর মিথস্ক্রিয়া বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিস্তৃতিকে আরো গতিময় করেছে যুগে যুগে। 

সভ্যতার শুরুতে  মানুষ শুধুমাত্র শিকারের জন্য বিভিন্ন উপজাতিগত ভাবে দলবদ্ধ হতে থাকে এবং ধীরে ধীরে গড়ে তুলে নগর, জনপদ আর এতে করে একে অপরের কাছাকাছি থাকা এবং নির্ভরতা বাড়তে থাকে। একজন আরেকজনের সাথে ভাগাভাগি করতে গিয়ে বিভিন্ন রোগের ও ভাগাভাগি হতে শুরুকরে। এই বৈশ্বিক নির্ভরতা কিংবা মিথষ্ক্রিয়া মহামারীর আকারকে বাড়াতে থাকে।   

ইতিহাস খোঁজ নিলে দেখা যায় জাস্টিনিয়ান প্লেগের ক্ষেত্রে প্রোকপিয়াস, সম্রাট  জাস্টিনিয়ান কে প্লেগের জন্য দোষারোপ করেন এবং তাকে শয়তান বলে ঘোষনা দেন ও ঈশ্বরের কাছে তার এই শয়তানির জন্য শাস্তি প্রার্থনা করেন। যদিও প্রোকপিয়াস ছিলেন জ্ঞানী এবংমহামারীর বিস্তারে মানুষের ভ্রমন ও বানিজ্যের সম্পর্ক বিষয়ে জ্ঞান রাখতেন, তারপরও দোষারোপের খেলাটা তিনি খেললেনই। এমনটা কিন্তু এখনো হচ্ছে। সে  যা হোক,  অনেকে অবশ্য মনে করেন জাস্টিনিয়ান প্লেগের কারনে রোম সাম্রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম দ্রুত পূনঃএকত্রিত হয় এবং সূচনা হয় অন্ধকার যুগের। 

এ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে  ভয়ানক মহামারীর ক্ষত তৈরী করে আছে প্লেগ। ১৬৫ খ্রিস্টাব্দে আন্টোনিন প্লেগের কথা জানা যায় এবং এর কারনে প্রায় ৫ মিলিয়ন লোক মৃত্যু বরন করে। অনেক ক্ষেত্রে এটাকে অবশ্য গ্যালেনের প্লেগও বলা হয়ে থাকে। এই প্রাচীন মহামারিটি এশিয়া মাইনর, গ্রীস এবং ইতালীতে বিস্তৃত হয়ে পড়ে। মানুষ এটিকে হয় জলবসন্ত কিংবা হাম বলে ধারনা করত।  যদিও এটির কারন সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু অজানা। মেসোপটেমিয়া থেকে থেকে রোম সৈন্যদের দ্বারা এ রোগটি ছড়িয়ে পড়েছিল বলেও মনে করা হয়। এটিকে  অনেকে  অজানা রোগও মনে করে। এরপরের ভয়ংকর মহামারীটিও ঘটে জাস্টিনিয়ান সময়  ৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দে।এটি ছিল একটি বুবোনিক প্লেগ। ইতিহাস বলছে, এই মহামারীতে ২৫ মিলিয়ন লোক মারা যায়, যা সে সময়ে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার সমান। এটিই ছিল প্রথম বুবোনিক প্লেগ। এতে বার্জান্টাইন সাম্রাজ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  বুবোনিক প্লেগ প্রথমবারের মত পৃথিবীতে বিশাল এক মৃত্যুযজ্ঞ চালায়, ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এক চতুর্থাংশ লোকের মৃত্যুর কারন হয়ে দাঁড়ায়। কনস্টান্টিপল শহরে  দিনে প্রায় ৫ হাজার লোক মারা যেত এবং শেষ হিসেবে  শহরের ৪০ শতাংশ লোক প্রান হারায় এই মহামারীতে।

দি ব্ল্যাক ডেথ (কালো মৃত্যু) নামের মহামারীটি ঘটে ১৩৪৬-১৩৫৩ খ্রিষ্টাব্দে। এটাও ছিল একটি বুবোনিক প্লেগ। এর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশ গুলোতে এবং কেড়ে নিয়েছিল ৭৫ মিলিয়ন থেকে ২০০ মিলিয়ন লোকের প্রান। ধারনা করা হয় এটির উতপত্তি এশিয়াতে এবং এটি ছড়িয়ে পড়ে ইদুরের মাধ্যমে। সে সময়ের সমুদ্র  বন্দরগুলিই ছিল প্রধান নগর এবং  এসব নগর ছিল ইঁদুরের প্রজনন কেন্দ্র, ফলে জাহাজে করে ইঁদুরের মাধ্যমে  তিনটি উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে মরনঘাতী অনুজীব। 

তৃতীয় কলেরা মহামারীটি ঘটেছিল ১৮৫২ থেকে ১৮৬০ সালে। কলেরা মহামারীর মাধ্যমে ১৯ শতকের এই ধ্বংসযজ্ঞটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। এর আগের প্রথম ও দ্বিতীয় কলেরা মহামারীর সাথে এটিরও উদ্ভব হয়েছিল  গাংগেয় বদ্বীপ অঞ্চল থেকে এবং এটি বিস্তৃত হয় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও  আফ্রিকায় এবং কেড়ে নেয় প্রায় ১ মিলিয়ন লোকের প্রান।জন স্নো লন্ডনের একটি দরিদ্র অঞ্চলে কলেরা নিয়ে গবেষনা করার সময় দেখতে পান যে, কলেরা মূলত সংক্রমিত হয় দূষিত পানির মাধ্যমে। ১৮৫৪ সালে যখন তিনি কলেরার কারন শনাক্ত করতে সক্ষম হন, ঠিক সে বছরেই যুক্ত্ররাজ্যে ২৩ হাজার লোক কলেরার কারনে মৃত্যুবরণ করে। 

ফ্লু মহামারীটি  ঘটে ১৮৮৯ থেকে ১৮৯০ সালে। কারন হিসেবে  দায়ী করা হয় ইনফ্লুয়েঞ্জাকে। এটিকে অবশ্য এশিয়ান ফ্লু কিংবা রাশিয়ান ফ্লুও বলা হত। এইচ৩এন৮ ধরনের এ ভাইরাসটির  প্রথম উদ্ভব ১৮৮৯ সালের মে মাসে এবং মধ্য এশিয়ার বুখারা,উত্তর-পশ্চিম কানাডার কিছু অঞ্চল এবং গ্রীনল্যান্ডের তিনটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই ফ্লু’র  সংক্রমনের গতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে ১৯ শতকের বিপুল জনসংখ্যা ও দ্রুত নগরায়ন ফলে প্রান হারায় ১০ মিলিয়ন মানুষ। উনিশ শতকে বিজ্ঞান ব্যাক্টেরিয়ার গবেষনায় ক্রমাগত আগাচ্ছিল এবং  এই মহামারী ফ্লু সম্পর্কে অনেক কিছু শিখতেও সাহায্য করেছে। 

১৯১০ থেকে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ছড়িয়ে পড়ে ষষ্ঠ কলেরা মহামারী। এর পূর্বের পাঁচটি কলেরা মহামারীর মত ষষ্ঠ কলেরা মহামারীর উৎপত্তিও ভারত বর্ষে। এটি মধ্য প্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ এবং রাশিয়ায়  ছড়িয়ে পড়ার আগে ৮ লাখেরও বেশী লোকের প্রান কেড়ে নেয়।  বলাচলে, ষষ্ঠ  কলেরা মহামারী ছিল আমেরিকায় কলেরার সর্বশেষ প্রাদুর্ভাব। পূর্বের কলেরা মহামারী থেকে শিক্ষা নিয়ে আমেরিকার জনস্বাস্থ্য  বিভাগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আগেই সংক্রমিতদের আলাদা করে ফেলে আর এতে করে মৃত্যুর হার কমে যায় এবং একারনে ১৯২৩ সালে কলেরায় মাত্র ১৩ জন মৃত্যুবরন করে।  

১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ফ্লু ঘটিত মহামারীর দগদগে ক্ষত বিস্ববাসী সহজে ভুলবেনা। এই মহামারীতে  বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ মানুষ সংক্রমিত হয় এবং ২০ থেকে ৫০ মিলিয়ন মানুষের প্রানহানী ঘটে। আক্রান্ত  ৫০০ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশহারে মৃত্যু হিসাব করা হয় এবং প্রথম ২৫ সপ্তাহে ২৫ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়। পূর্বের ফ্লু মহামারী থেকে এটি একটু ভিন্নতর ছিল। যেখানে অন্যান্য ফ্লু গুলোতে সাধারনত কিশোর, বৃদ্ধ কিংবা দূর্বল লোক বেশী আক্রান্ত  হত সেখানে ১৯১৮ এর ফ্লু’তে বেশী আক্রান্ত হয় স্বাস্থ্যবান তরুন ও শিশুরা। 

এশিয়ান ফ্লু’র আরেকটি  মহামারী ঘটে ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে। কারন হিসেবে শনাক্ত করা হয় ইনফ্লুয়েঞ্জাকে। এইচ২এন২ সাব  টাইপের এই ভাইরাসটির উদ্ভব হয় ১৯৫৬ সালে চীনে এবং  তান্ডব চালায় ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই দুই বছরে এশিয়ান ফ্লু চীনের গুইঝো প্রদেশ থেকে হংকং, সিঙ্গাপুর হয়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ভ্রমন করে এবং সংক্রমিত করে। সারা পৃথিবীতে ২ মিলিয়ন মৃতের মধ্যে শুধুমাত্র যুক্ত্রাষ্টেরই ছিল ৯ হাজার ৮০০ জন। 

সময়ের পরিক্রমায় চিকিতসা শাস্ত্রের অনেক উন্নতি হয়েছে, বেড়েছে প্রযুক্তিগত দক্ষতা যা এধরনের মহামারী ঠেকাতে অনেক কাজ করতে পারে। কিন্তু বৈশ্বিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে  সারা পৃথিবীর দেশ গুলো যোগাযোগগত  দিক দিয়ে অনেক কাছাকছি চলে এসেছে। মানুষ তার প্রয়োজনে  ছুটে চলছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। এই ছুটে চলার পথে মরনঘাতী অনুজীব গুলোকে  নিজের অজান্তে কিংবা জেনেই অতি দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে সারা দুনিয়ায়। আজ ২০২০ সালে এসে যদি  করোনা বা কোভিড ১৯ এর বিস্তারের দিকে তাকালে দেখা যায় কত দ্রুত গতিতে সারা পৃথিবীতে। প্লেগের মহামারী থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য চতুর্দশ শতকে উপকূলীয় শহর গুলোতে  শুরু হয় পৃথকীকরনের কৌশল অবলম্বন। জাহাজ থেকে অবতরনকারীদের জন্য ৪০ দিনের আলাদা ভাবে অবস্থানের এই  প্রক্রিয়াটির নাম দেয়া  হয় ‘ কোয়ারান্টা গিওরনি’ (Quaranta gironi)। শত শত বছর আগে মানুষের অনুসরন করা পদ্ধতি এখনো অনুসৃত হচ্ছে সংক্রমন ঠেকানোর জন্য।  আগে হয়তো মানুষ এসব মেনেও চলত ঠিকঠাক মত। কিন্তু এখন পাখীর মত উড়তে শেখা মানুষকে ঘরে আটকে রাখা কঠিন ব্যাপার। 

২২ এপ্রিল ২০২০ খ্রিস্টাবব্দ, সরকারী হিসেবে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৭৭২ জন, ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছে ৯২ জন এবং মৃত্যুবরন করেছে ১২০ জন।বিশ্বব্যাপী ১৯৯ টি দেশে  আক্রান্তের সংখ্যা ২.৫ মিলিয়ন, ইতোমধ্যে মৃত্যুবরন করেছে ১ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮২২। করোনা (কোভিড ১৯) এর গতি প্রকৃতি নিয়ে এখনো জানার অনেক বাকী। কোভিড ১৯ এর প্রকৃত প্রভাব গননা এবং পূর্বাভাস দেওয়া বেশ কঠিন কারন এর প্রাদুর্ভাব এখনো অব্যাহত রয়েছে। নিত্য চেহারা বদলানো এই ভাইরাসটি সম্পর্কে  গবেষকরা এখনো শিখছেন।এখনো এর কোনো প্রতিষেধক তৈরী হয়নি। এর জন্য চলছে গবেষনা। হয়তো গবেষনাগারে একদিন এর প্রতিষেধক  তৈরী হবে, এর পরেই একজন চিকিতসক এর প্রয়োগে ভালো করে তুলবেন আক্রান্তকে। তার আগ পর্যন্ত আইসোলেশন আর কোয়ারেন্টাইনের মত চতুর্দশ শতকে চালু হওয়া পদ্ধতিই অনুসরন করতে হবে। হয়তো ভবিষ্যত প্রজন্ম তাদের কোনো দূর্যোগময় মহামারী সময়ে আজকের এই কোভিড ১৯ এর কথা লিখবে। সবাইকে স্মরন করিয়ে দিবে ‘ঘরে থাকুন সুস্থ থাকুন’। 

লেখক: অধ্যাপক, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ; মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin