শুক্রবার,১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ অপরাহ্ন

বাংলা সিনেমার সেকাল-একাল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩০ নভেম্বার, ২০১৯ ১৯ ৪১

পিনাক মন্ডল-

চলচ্চিত্র দৃশ্যমান বিনোদন মাধ্যম হলেও মধ্যে থাকা চাই শিল্প। প্রশ্ন হল চলচ্চিত্রে শিল্প  কি? দৃশ্য বা অদৃশ্য কোন ভাবরূপ শিল্পীর মনে নবরূপায়িত হয়ে যে গতিশীল রূপ প্রকাশ ঘটায় তাই তো শিল্প। তাহলে আমাদের দেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা শুধু কি দৃশ্য ভাবরূপ দেখেন। মানুষেরে মনে অদৃশ্য ভাবরূপ যে নবচেতার উদ্রকে ঘটায় তা  নির্মাতারা ভাবেন না! যদি তারা ভাবতেন তবে বাংলা সিনোমার এহেন দশা হয়ত হত না। চলচ্চিত্রের সাথে জড়িত থাকে একটি জনগোষ্ঠীর সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সামাজিক রীতি-নীতি, উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান, রাজনীতি, ধর্ম ও দর্শন।

যে সংস্কৃতিতে সিনেমাটি নির্মিত হয় তা প্রতিনিধিত্ব করে সেই সমাজটিকে। তাই তো সিনেমাকে শিল্প কলার প্রভাবশালী বিনোদন মাধ্যম। কিন্তু আমাদের বর্তমান সময়ের সিনোমা সমাজ ও সংস্কৃতির কথা বলে কি? একটি সমাজের সঙ্গতি ‌ও অসঙ্গতি  দিক সিনেমার গল্পে বহিঃপ্রকাশ ঘটানো আবশ্যক। তাই তো বাংলা সিনেমা আজ জনসর্মথন এবং আবেদন হারিয়ে রিক্ত ও শূণ্য।

অথচ বাংলা সিনোমার একসময় ছিল নিজস্ব ভাবধারা। যা স্বীয় বৈশিষ্ট্যৈ ছিল বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। তখনকার সময়কে বলা হত বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগ। সেই যুগে বাংলা সিনেমার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিল- উত্তম, সৌমিত্র, অনিল, সুচিত্রা, সুপ্রিয়া, মাধবী, সন্ধ্যা'র মত অভিনেতা অভিনেত্রীরা। মনে হত,পৃথিবীতে কোথাও এমন অভিনেতা অভিনেত্রীরা নেই। সে যুগে স্কুল পালিয়ে ম্যাটিনী শোতে 'প্রথম কদম ফুল' সিনেমা দেখে বাস্তব জীবনেও প্রথম কদম ফুল ফুটত। সপ্তপদী সিনেমার এই পথ যদি না শেষ হয় গানটি গাইলেই নিজের প্রেমিকার মাঝে 'রীনা ব্রাউন' এর চেহারা খুঁজে পাওয়া যেত।

সে যুগে নির্মিত হয়েছিল পথের পাঁচালি (১৯৫৫), গুপী গাইন বাঘা বাইন (১৯৬৯), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), অরণ্যের দিন রাত্রি (১৯৭০), হীরক রাজার দেশে (১৯৮০), নায়ক (১৯৬৬), অপুর সংসার (১৯৫৯), অশনি সংকেত (১৯৭৩), চারুলতা (১৯৬৪), জন অরণ্য (১৯৭৬) মত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

সামজিক বিষয়কে অবলম্বন করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ-কুশলতায় বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। পরবর্তী সময়েও এসে বেশ কয়েকটি সিনেমা মানুষের মন কেড়েছিল। তন্মধ্যে অন্যতম- জহির রায়হানের  'হাজার বছর ধরে', হুমায়ূন আহমেদের 'ঘেটুপুত্র কমলা', ঋত্বিক ঘটকের 'তিতাস একটি নদীর নাম',  চাষী নজরুল ইসলামের 'হাসন রাজা', 'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড', তানভীর মোকাম্মেলের 'লালন', মোরশেদুল ইসলামের 'দুখাই', 'লালসালু', আখতারুজ্জামানের 'পোকামাকড়ের ঘরবসতি', তারেক মাসুদের 'মাটির ময়না', কাজী মোরশেদের 'ঘানি' (২০০৮) উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে অন্যতম।

এ সকল সিনেমায় স্থান পেয়েছিল স্বাধীনতা যুদ্ধের করুণ চিত্র, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী দুর্ভিক্ষের সময়কালের তীব্র খাদ্যাভাবের অসহনীয় পরিস্থিতি,বাঙালির চিরাচয়িত ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় চেতনা, লোকজ জীবনধারা, গ্রামীন মানুষের দুঃখ দুর্দশা, ধর্মীয় কুসষ্কার। যা আজও এমন শিক্ষা দেয় যার প্রভাব সারাটি জীবন আমাদের মধ্যে বহমান।

কিন্তু সত্তরের দশকের পরে আমাদের চলচ্চিত্রের উপর যে আঘাতটি  আসে তা হল মারপিট ও মারদাঙ্গা। যার সূত্রপাত ঘটেছিল 'রংবাজ' (১৯৯৩) সিনেমাটির হাত ধরে। শুরু হল গল্প চুরির অবাধ স্বাধীনতা, যে স্বাধীনতা আজও বাংলা সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনুকরণ প্রথা যে ষাটের দশকেও ছিল না, তা নয়। তবে সে অনুকরণ ছিল ছবির নায়ক নায়িকার স্বল্প সংলাপ। এ পার বাংলায় রাজ্জাককে দেখা যেতো উত্তম কুমারের অনুকরণে চুলের বিন্যাস করতে। সুচিত্রা সেনের সাজসজ্জ্বার অনুকরণে ছিল আমাদের নায়িকার সাজ। যা ছিল শুধুমাত্র বহিরঙ্গের অনুকরণ। না ছিল অভিনয়ে মার্ধুয্য, না ছিল কোন শিল্প। তবে এখন এমন সিনেমা তৈরি হচ্ছে না, তা নয়। সামাজিক সিনেমা অনেকটাই কম, নেই বললেই চলে।

চলচ্চিত্র সমাজের দর্পণ। সে দর্পণে ফুটে ওঠে সেই সমাজের সার্বিক চিত্র। বর্তমানে অতি বাণিজ্যনির্ভর সিনেমাগুলোর কাহিনী কৃত্রিম। বাস্তবতার সাথে খুব একটা মিল নেই। দর্শকের মনোজগতে প্রভাব ফেলে না। দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রভাব নেই। নেই সত্যজিৎ রায়ের পথের পাচালির মতো জীবনধর্মী কাহিনী। কিংবা ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারার মতো অসাধারণ গল্প। 

মানসম্মত চলচ্চিত্র না থাকায় দর্শক হলবিমুখ। ফলে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে চলচ্চিত্র শিল্পের দিকে নজর দেয়ার। আমাদের পাশের দেশ চলচ্চিত্র শিল্পের মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে কিন্তু আমরা মুখ থুবড়ে পড়েছি। চলচ্চিত্র অঙ্গনে সকল অসঙ্গতি, অন্তরায় দূর করে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান কাম্য। বাংলা সিনেমায় ফিরে আসুক সেই সোনালী অতীত এমনটিই প্রত্যাশা।

লেখক: শিক্ষার্থী; ফোকলোর বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Rokonuddin
Theme Developed BY Rokonuddin