শুক্রবার,৫ জুন, ২০২০ অপরাহ্ন

সাধারণ মানুষের কাঙাল ছিলেন যিনি; মনে পড়ে?

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২০ ১১ ২৭

সাইফুল ইসলাম-

যিনি সাংবাদিক, তিনিই সম্পাদক, তিনিই আবার পত্রিকা লেফাফা ও বিলিকারক। তাকে সামলাতে হতো মূল্য আদায়কারী অর্থ সংগ্রাহকের দায়িত্বও। শুরুর দিকে এমনই ছিল গ্রামীণ বাংলার সাংবাদিকতার চিত্র। একজনই করতেন এতসব। সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে এভাবেই খবর পৌঁছাত মানুষের কাছে। কাগজে ছাপার অক্ষরে ফুটিয়ে তোলা হতো মানুষের কথা, মানবতার কথা। তিনি গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার। নিজেকে তিনি 'কাঙাল' নামেই পরিচিত করতেন আধ্যাত্মিক বাউল সাধনায়।

আজ ৫ বৈশাখ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (১৮ এপ্রিল ২০২০ খ্রিস্টাব্দ) রোজ শনিবার, গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃত, মহান শিক্ষক, সমাজ সেবক ও সংস্কারক এবং বাউল সাধক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার এর ১২৪ তম তিরোধান দিবস। আজ সকালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের শাখা জাদুঘর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে নিয়োজিত সকল স্টাফ এই মহান ব্যাক্তিকে শ্রদ্ধাসহ তার আত্মার শান্তি কামনা করে।

এই জাদুঘরের পরিচালক এহসানুল হ চৌধুরী জানান, করোনাভাইরাসের কারনে সকল অনু অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে।

কুষ্টিয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। আর যাঁরা এতদঞ্চলের শিল্প-সাংস্কৃতিক রাজ্য শাসন করেছেন, যাঁদের অবদানে কুষ্টিয়া সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাতি পেয়েছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন শ্রী হরিনাথ মজুমদার। তিনি কাঙাল হরিনাথ মজুমদার নামেই বেশি পরিচিত। আবার কখনও কাঙাল ফিকিরচাঁদ বা ফিকিরচাঁদ বাউল নামেও তিনি পরিচিত।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নদিয়া জেলার (বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা) গড়াই নদী কোলঘেঁষা কুমারখালী গ্রামের কুন্ডু পাড়ায় ১২৪০ বঙ্গাব্দ ৫শ্রাবণ মোতাবেক ১৮৩৩ সালের ২২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৮৯৬ সালের ১৮এপ্রিল বাংলা ১৩০৬ সালের ৫বৈশাখ, ৬৩বছর বয়সে তিনি পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তিনি ৩পুত্র, ১কন্যা ও স্ত্রী স্বর্ণময়ীকে রেখে যান। 

হরিনাথের পিতার নাম হরধরচন্দ্র মজুমদার ও মাতার নাম কমলিনী দেবী। খুব ছোটবেলায় তাঁর পিতা-মাতা ইহধাম ত্যাগ করেন। বাল্যকালে কৃষ্ণনাথ মজুমদারের ইংরেজি স্কুলে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। দারিদ্র্যের বাতাবরণে বেড়ে উঠতে থাকেন তিনি। তাই অর্থাভাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষায় বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেন নি। তবে সারা জীবন অবহেলিত গ্রাম-বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের জন্য ও শোষণের বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের মাধ্যমে আন্দোলন করেন তিনি। গোপালকুণ্ড যাদবকুণ্ড, গোপাল স্যানাল প্রমুখ বন্ধুদের সাহায্যে ১৩ জানুয়ারি ১৮৫৫ সালে নিজ গ্রামে একটি ভার্ণাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং অবৈতনিক শিক্ষকতা শুরু করেন। অবস্থাসম্পন্ন পরিবারে জন্মগহণ করেও তিনি কিশোর বয়সেই জীবন-জীবিকার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। 

কর্মজীবনের শুরুতেই তিনি দু’পয়সা বেতনে কুমারখালী বাজারে একটি কাপড়ের দোকানে চাকুরি নেন। দিনের বেলা খরিদ্দারের তামাক সাজা, কাপড় গোছানো এবং সন্ধ্যায় দোকানের খাতা লেখার কাজ করতেন। এরপর কিছুদিন মহাজনের গদিতে লেখালেখি, ৫১টি কুঠির হেড অফিস কুমারখালীর নীলকুঠিতে শিক্ষানবিস হিসেবে চাকুরি নেন। ইংরেজ ও জমিদারদের নানা অত্যাচার-অনাচার দেখে সইতে না পেরে তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই চাকুরি ছেড়ে দেন।

নীলকুঠিতে চাকুরিরত স্বল্পকালীন কর্মজীবনে হরিনাথ রায়ত-প্রজার ওপর কুঠিয়ালদের অত্যাচার ও শোষণের স্বরূপ নিজ চোখে দেখেন। হরিনাথের শুভাকাঙ্খি আত্মীয়রা কুমারখালী নীলকুঠিতে তাঁকে চাকুরির ব্যবস্থা করেছিলেন এবং তাঁরা ভেবেছিলেন হরিনাথ আমিন বা গোমস্তার পদ লাভ করে ভালো অর্থ উপার্জন করবেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্য ধাঁচের গড়া। কারণ, নীলকুঠিতে কর্মরত অধিকাংশ কর্মচারিকেই অসচ্চরিত্র, ঘুষখোর, মিথ্যাবাদী এবং প্রজানিপীড়ক বলে তাঁর মনে হয়েছিল। হরিনাথ কাঙালের জীবনীকার অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, “এ শোষণের প্রতিকারের চিন্তা থেকেই পরে হরিনাথ মজুমদার ‘গ্রামবাংলা প্রকাশিকা’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন।”

কাঙাল হরিনাথকে এদেশীয় গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বা জনকও বলা হয়। ঈশ্বরগুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু হলেও পরে ১৮৬৩ সালের এপ্রিলে বাংলা ১২৭০সালে ১লা বৈশাখ তিনি নিজেই প্রকাশ করেন ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা। পরে এটি পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক রূপে প্রকাশিত হয়। চার ফর্মার পাঁচ আনা মূল্যের মাসিক গ্রামবার্তা প্রথমে প্রকাশিত হতো কোলকাতার গীরিশ বিদ্যারত্ন প্রেস থেকে। পরে ১পয়সা মূল্যের সাপ্তাহিকীতে রূপান্তরিত হয়।

বাংলা পিডিয়ায় বলা হয়েছে, ১৮৬৪ সালে কুমারখালীতে স্থাপিত হয় মথুরানাথ যন্ত্র। বিখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র পিতা হরিনাথের বন্ধু মথুরনাথ মৈত্রেয় এটি প্রতিষ্ঠিত করেন। পরে তিনি মুদ্রণ যন্ত্রটি হরিনাথকে দান করেন। ১৮৭৩ সাল থেকেই এ যন্ত্রেই গ্রামবার্তা প্রকাশিত হতে থাকে। ২২ বছর ধরে পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল। 

হরিনাথ কয়েক বছর ‘গ্রামবার্তা’ পরিচালনা করে ধার-দেনায় জেরবার হয়ে উঠেন। তখন কুমারখালী বাংলা পাঠশালার প্রধান শিক্ষক প্রসন্ন কুমার বন্দোপাধ্যায় ও হরিনাথের কয়েক হিতৈষী বান্ধব ‘গ্রামবার্তা’র পরিচালনার ভার নেন। কিন্তু দেনা বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে হরিনাথ পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে দেন। পরে ১২৮৯ বাংলা সনের বৈশাখ মাসে কাঙাল-শিষ্য জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, শিবচন্দ্র বিদ্যার্ণব প্রমুখের উদ্যোগে ‘গ্রামবার্তা’ (সাপ্তাহিক) আবার প্রকাশিত হয় এবং ১২৯২ সালের আশ্বিন পর্যন্ত চালু থাকে। এ মুদ্রণ যন্ত্রের মাঝখানে এ যন্ত্রটির উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদনের তারিখ লেখা রয়েছে। লন্ডনের ১০ ফিন্সবারি স্ট্রিটের ক্লাইমার ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে কলম্বিয়ার প্রেস মডেলের ১৭০৬ নম্বর এ মুদ্রণ যন্ত্রটি তৈরি করা হয়। প্রয়াত এডওয়ার্ড বিভান এ যন্ত্রটি পেটেন্ট করেন।

অমৃতবাজার পত্রিকায় ১২৮০ সালের ১৭ শ্রাবণ সংখ্যায় কুমারখালীতে কাগজ ছাপাকল বসার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সে খবর লোকমুখে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অসংখ্য লোক তাই দেখতে আসে কেমন করে কাগজের গায়ে এতো ছোট লেখা হয়। ৩০-৩৫ মণ ওজনের ডাবল ক্রাউন সাইজের বিশাল এ মেশিন দেখতে দানবের মতো। এ মেশিনে কাগজ ছাপাতে তিনজন লোক লাগতো। মেশিন চলাকালে দেখা যেতো মেশিনের মাথার উপর ডানা প্রসারিত বিশাল ঈগল পাখিটা উড়ে গিয়ে আবার যথাস্থানে ফিরে আসছে। দেশ -বিদেশ থেকে প্রায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা এ প্রেস দেখতে আসতেন।

কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ ছিল সময়ের বিপরীত স্রোতে। ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় হরিনাথ সাহিত্য, দর্শন-বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করেন। গণসংগীত শিল্পী কমরেড হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেন, “রবীন্দ্রনাথের আগে ঠাকুর পরিবারের যেসব সদস্য জমিদার হিসেবে শিলাইদহে এসেছিলেন তাঁরা প্রজাবৎসল ছিলেন না। তাঁদের অত্যাচারের কথা হরিনাথ ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় সাহসের সাথে লিখতেন। এক পর্যায়ে জমিদার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কাঙালকে শায়েস্তা করতে চেয়েছিলেন।” এমনকি হত্যার জন্য ভাড়াটে লোক লাগিয়েছিলেন। তখন লালন সাঁইয়ের অনুসারীরা তা প্রতিহত করেন এবং হরিনাথের বাড়িতে এসে পাহারা দিয়ে তাঁকে রক্ষা করেন। ফকির লালন সাঁইয়ের সাথে হরিনাথের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এছাড়া মীর মোশাররফ হোসেন, প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, দীনেন্দ কুমার রায় প্রমুখ ছিলেন তাঁর শিষ্যতুল্য এবং ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র লেখক। হরিনাথ নিজেও ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি অসংখ্য বাইল গান লিখেছেন।

কাঙাল হরিনাথ নিজেই গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং পাঠকদের হাতে তুলে দিতেন একটি বলিষ্ঠ পত্রিকা। ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ ছিল নিতান্তই একটি নির্ভীক সাংবাদিকতার আদর্শ পত্রিকা। প্রশাসনযন্ত্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের ত্রুটি-বিচ্যুতি-স্খলনকে ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে। পাবনার তৎকালীন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট মি. হামফ্রে একবার এক দরিদ্র বিধবার একটি দুগ্ধবতী গাভী জবরদস্তি করে সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে এ ঘটনা জানতে পেরে কাঙাল হরিনাথ ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’য় ‘গরুচোর ম্যাজিষ্ট্রেট’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেন। ম্যাজিষ্ট্রেট রাগান্বিত হন। শাস্তি দিতে ছুটে যান হরিনাথের প্রেসে। পরে অবশ্য ক্ষমা চান। পরে তিনি হরিনাথকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “এডিটর, আমি তোমাকে ভয় করি না বটে, কিন্ত তোমার লেখনীর জন্য অনেক কুকর্ম ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়েছি।”

‘গ্রামবার্ত্তা’ জনকল্যাণ ও সৎ-সাংবাদিকতার যে আদর্শ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল শত সংকটেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ‘গ্রামবার্ত্তা’র সাফল্য সম্পর্কে জলধর সেন বলেছেন,“গ্রামবার্ত্তা দ্বারা, প্রদেশের প্রভূত উপকার সাধিত হইয়াছিল।

ইহা যে কেবল জমিদারের মহাজনের এবং নীলকুঠির অত্যাচার নিবারণের মুষ্টিযোগ স্বরূপ হইয়াছে তাহা নহে, প্রজার প্রতি রাজার কর্তব্য সম্বন্ধে যেসকল প্রবন্ধ থাকিত তদানুসারে কার্য্যকরিতে গবর্ণমেন্টেরও যথেষ্ট অনুরাগ লক্ষিত হইত।

...নদীখাল প্রভৃতি পয়ঃপ্রণালী সংস্কারপূর্ব্বক জলকষ্ট নিবারণ, পুলিশ-বিভাগের সংস্কার ব্যবস্থা, গো-ধন রক্ষা, রেলপথ দ্বারা জলনিঃসরণের পথ বন্ধ হওয়ায় এদেশ যে অস্বাস্থ্যকর ও ম্যালেরিয়ার আকর ভূমি হইতেছে, পোষ্টাফিসের মনিঅর্ডার প্রথা প্রচলন প্রভৃতি অনেক প্রয়োজনীয় বিষয় সম্বন্ধে হরিনাথ লেখনী পরিচালনা করিয়া রাজা ও প্রজা উভয়েরই হিতাকাক্ষী বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন। তৎকালে ‘সোমপ্রকাশ’ ও ‘গ্রামবার্ত্তা’ই উচ্চশ্রেণীর সাময়িক পত্র ছিল” (‘কাঙ্গাল হরিনাথ’, ১ম খন্ড, কলকাতা, ১৩২০; পৃ. ১২)।

কৃষক-তাঁতি, রায়ত-প্রজা, শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা ও অধিকার সম্পর্কে ‘গ্রামবার্ত্তা’র ভূমিকা ও সচেতনতা ছিল প্রবল ও আন্তরিক। এদের অভাব-অভিযোগের কথা বলতে গিয়ে ‘গ্রামবার্ত্তা’ কোনো দ্বিধা বা কুণ্ঠাবোধ করেনি কখনো। এইদুঃখ-দুরবস্থার বর্ণনায় রায়ত-প্রজার প্রতি সহানুভূতি, সরকারি ভূমিকা সম্পর্কে অভিযোগের সুরও কখনো কটাক্ষের আভাসও মেলে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারের দায়িত্ববোধের অভাব বা ঔদাসীন্য সম্পর্কে বেদনা ও অভিযোগ জানিয়ে কর্তব্য চেতনা জাগানোর চেষ্টা রয়েছে। দেশীয় শোষক-জমিদার কিংবা বাক সর্বস্ব তথাকথিত দেশ প্রেমিকদের আচরণ ও ভূমিকাও পত্রিকায় সমালোচিত ও নিন্দিত হয়েছে।

দেশীয় তাঁতি সম্প্রদায়ের দুরবস্থা এবং সরকারের ঔদাসীন্য সম্পর্কে ‘গ্রামবার্ত্তা’র মন্তব্য স্বদেশিকতার বিশেষ পরিচয় বহন করে : ‘লাঙ্কেষ্টরের তাঁতিরা যতদিন গবর্ণমেন্ট হৃদয়ে বাস করিবে, ততদিন এদেশীয় তাঁতি-জোলার দুরবস্থা সেই হৃদয়ে স্থান পাইবে, এরূপ ভরসা করা যায় না’ (নভেম্বর১৮৭৩)।

কৃষির উন্নতি ও মধ্য শ্রেণির আয়-উপার্জনের বিষয়টি পরস্পর সাপেক্ষ বিবেচনা করে ‘গ্রামবার্ত্তা’ অভিমত প্রকাশ করেছে,‘এক্ষণে গ্রাম ও পল্লীবাসী মধ্যবিত্ত লোকের জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হইয়াছে।... জমিদারদিগের সহিত প্রজাদিগের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত না হইলে, গ্রাম ও পল্লীবাসী মধ্যমাস্থ লোকদিগের অবস্থান্নোতির অন্যকোন উপায় নাই। বস্তুতঃ মধ্যবৃত্তি লোকের কৃষিকার্য্যে নিযুক্ত না হইলে চাষের উন্নতি হইবে না।

খাল খনন করিয়া নদীর জল আনিলে কোন ভূমির উপকারও কোন ভূমির অপকার হয়; কি প্রণালীতে চাষ করিলে অধিক লাভ হইতে পারে; ইত্যাদি কৃষিকার্য্য বিষয়ী জ্ঞান যাহা কিছু, মধ্যবৃত্তি ও চাষালোকেরই আছে; বিলাসী বড় মানুষদিগের তাহা কিছু মাত্র নাই’ (জানুয়ারি ১৮৭০)।

কাঙাল হরিনাথ শুধু একজন সাংবাদিকই ছিলেন না । তিনি কবিতা, উপন্যাস,ও শিশুদের জন্য লিখতেন। এছাড়া রচনা করেছেন নাট্যগ্রন্থ ও বিভিন্ন প্রবন্ধ গ্রন্থ।

বিভিন্ন গবেষকদের থেকে জানা যায়, তিনি ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘বিজয়-বসন্ত ’একটি সফল উপন্যাস। তিনিই প্রথম লালন ফকিরের গান নিয়ে বই লেখেন।

পরিশেষে বলতে চাই, কালের হিসেবে যে অল্প সময়ে এই মহাসাধক, সমাজ বিপ্লবী তার সামসময়িক সময়ে সমাজ পরিবর্তনের জন্যে যে ভূমিকা রেখেছেন তা অবিস্মরণীয়। তৎকালীন পশ্চাদপদ সমাজে তিনি জাগরণের সূর হয়ে বেজে উঠেছিলেন বাংলার সর্বত্র। সেই সূর আমাদের সকলের মাঝে অনুরণিত হোক এ প্রত্যাশা রাখি।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin