মঙ্গলবার,১৯ জানুয়ারী, ২০২১ অপরাহ্ন

৭১মানে ঘাড় বাঁকা করে শত্রুপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা'

রিপোর্টারের নাম: আন্দোলন৭১
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ ডিসেম্বার, ২০২০ ১২ ২৯

স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের যাদের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ শুধু আমাদের কাছে একটি রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের গল্প নয়। আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে সাম্প্রদায়িক সামরিক জান্তার অস্ত্রের মুখ থেকে একটি জাতির মুক্তি। আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে লাহোর কিংবা করাচি থেকে কথায় কথায় দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া অমানুষ গুলোর চোখ রাঙ্গানিকে সমীহ না করা। আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ মানে মায়ের ভাষা যারা কেড়ে নিতে চেয়েছিলো তাদের গুলি আর গ্রেনেডে উপযুক্ত জবাব দেয়া। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার বহমান ঢেউয়ে আমি এখনো ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত দেখতে পাই। গণকবর থেকে এখনো চিৎকার আসে ইয়াহিয়া খানের মরনত্তর বিচার হলে শহীদী আত্মা শান্তি পাবে। ধর্ষিতা মায়ের শাড়ির আঁচলে রাজাকার ও হানাদার বাহিনীর নখের আঁচড় লেগে আছে। একযুগ আগেও আমার স্বাধীন দেশে রাজাকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ছিলো! ১৯৭১ সাল আমার কাছে শুধু একটি সংখ্যা নয়, ৭১মানে ঘাড় বাঁকা করে শত্রুপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা।

স্বাধীনতার সূচনা


পরাধীনতা নিয়ে কেউ বাঁচতে চায় না। সবাই চায় পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত জীবনযাপন করতে। আমাদের দেশের মানুষও পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি ছিনিয়ে এনেছে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনীর কাছ থেকে। আর তা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এজন্য এ দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় বিজয়। ১৬ই ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। তাই বিজয় দিবস আমাদের আত্মমর্যাদার ও আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক।এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে বহুদিনের শোষণ বঞ্চনার পর জেগে ওঠা এক জাতির মরণপণ লড়াইয়ের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া পাকিস্তানের দুই প্রান্তে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দুটো জাতির বসবাস। পশ্চিম পাকিস্তান শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে নানা ভাবে শোষণ করছিল । এরপর ১৯৫২ সালে যখন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিচ্ছিল এরপর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও সরকার গঠনের সুযোগ পায় নি।


প্রতিটি স্বাধীন জাতির স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত নানান ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আবেগ। তেমনই আমাদের বাংলাদেশের বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপটে রয়েছে বিপুল ত্যাগ ও সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। সে ইতিহাসের এক গৌরবময় মাইলফলক মহান ভাষা-আন্দোলন। এই আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। পরে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী জঙ্গিবাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম। এ পটভূমিতেই ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বীর বাঙালি। শুরু হয়, এ দেশে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ঘটনা- মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে চলে মুক্তিসেনাদের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ বাঙালি জীবন বিসর্জন দেয়। অবশেষে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির বিজয় সূচিত হয়। এই দিনে ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে) ঘটে ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় ঘটনা- পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মাথা নিচু করে অস্ত্র মাটিতে ফেলে আত্মসমর্পণ করে আমাদের বীর মুক্তিবাহিনীর কাছে।

বঙ্গবন্ধু ছিলো এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের কেন্দ্রবিন্দু, বঙ্গবন্ধুর চোখ দিয়ে পূর্বপাকিস্তানের মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতো।বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণাবলি ছিলো আকাশচুম্বী, পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বিশ্ববরেণ্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তারা হয়তো একটি ধর্মীয় জাতির অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছেন, আবার কেউ বর্ণবাদে বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, আবার কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য অস্ত্র ধরেছেন। বঙ্গবন্ধু একমাত্র বিশ্ব নেতা যিনি নিজের স্বার্থের কথা কখনো চিন্তা করেননি, তিনি অনেক বর্নের অনেক ধর্মের অনেক মতের মানুষের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমরা যখন মরতে শিখেছি আমাদের কেউ দাবায় রাখতে পারবে না, সত্যি এই একটা কথা এদেশের মানুষের অন্তরে এমন ভাবে গেতে গিয়েছিল নিজের জীবনের বিনিময় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার জন্য দামাল ছেলেরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামের যুদ্ধটা আমরা ৯ মাসে শেষ করেছি কিন্তু দেশ বিনির্মানে যে লড়াই সেটা হয়তো ৯ মাস ৯ বছর কিংবা ৯০ বছরেও সম্ভব নয়, দেশ বিনির্মানে লড়াইটার সাথে মিশে আছে আমাদের সভ্যতার লড়াই, আমাদের সংস্কৃতির লড়াই, আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার লড়াই। কিন্তু সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী একাত্তরের পরাজিত প্রেতাত্মারা বারবার খামচে ধরেছে আমাদের স্বাধীন বাংলার মানচিত্র ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বিপথগামী কিছু সেনা সদস্য সপরিবারে হত্যা করেছিল আমাদের আদর্শিক পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় বিদেশে থাকায় বেঁচে যান তার দুই কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে সদ্য জন্ম নেয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রকে তারা গলা টিপে হত্যা করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারই রক্তের উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে এ দেশে ঢুকতে দেয়নি তৎকালীন সামরিক সরকার জিয়াউর রহমান, সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ ই মে নিজের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে এদেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য দেশরত্ন শেখ হাসিনা ফিরে ছিলেন মাতৃভূমিতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট এর পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত যারাই এ দেশের ক্ষমতায় বসেছেন তারা সকলেই পাকিস্তানি কায়দায় এই স্বাধীন রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে।


১৯৯৬ সালের ২৩ ই জুন সকল বাঁধা উপেক্ষা করে জনগণের রায় নিয়ে রাস্ট্র ক্ষমতায় আসেন বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী বাঙালি জাতির আশার বাতিঘর জননেত্রী শেখ হাসিনা। শুরু হয় নতুন এক অধ্যায় মানুষ ফিরে পায় তাদের গনতান্ত্রিক অধিকার, মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা নামক সূর্য আবার আলোকিত করে বাংলাদেশের আকাশ বাতাস, এদেশের মুক্তি পাগল মানুষ যে উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল সেই প্রত্যাশার পরিপূর্ণতা পেতে থাকে দেশরত্ন শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় এগিয়ে যেতে থাকে প্রিয় মাতৃভূমি, মুখ থুবড়ে পরা অর্থনীতির চাকা দারুণ ভাবে সচল হতে থাকে, শুরু হয় নতুন এক জাগরণ, যেখানে ছিলো মানুষের অধিকার ছিলো স্বচ্ছ জবাবদিহিতা।

কিন্তু২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পরাজয় বরণ করে। শুরু হয় আবার অরাজকতা মৌলবাদী শক্তির হাতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা চলে যায়, দূর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক নিয়মিত বোমা ফুটতো বাংলাদেশে, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ছিলো নিত্যদিনের খোরাক, দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে হত্যার নীলনকশা তৈরি করেছিল চারদলীয়জোট সরকার, সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা ২১ আগস্ট দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক কথায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ছিলো খালেদা নিজামীদের কাছে দুধভাতের মতো। সমস্ত দেশকে তারা কারাগারে রুপান্তরিত করেছিল, আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীকে তারা নৃশংস ভাবে হত্যা করে।

দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আবার ঘুরে দাঁড়ায় আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি দ্বিতীয়বারের মত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশ বিনির্মানে সম্পুর্ণ মনোযোগ দেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা সাধারণ মানুষের মনে সন্ত্রাসের ভীতি দূরকরে সাহস সঞ্চারিত করেন, বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন করে দেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করেন। এদেশের মানুষের প্রাণের দাবী রাজাকার আলবদর বাহিনীর বিচার কার্য শুরু হয় অন্তর্জাতিক ট্রাইবুনাল গঠনের মাধ্যমে। কিন্তু বিচার কার্য শুরু হওয়ার পর পর দেশকে আবার অস্থিতিশীল করে তুলে ৭১ এর পরাজিত শক্তি, শুরু হয় আগুন সন্ত্রাস চলন্ত বাসে আগুন দিয়ে তারা মানুষ পুড়িয়ে মারে, দিনের পর দিন তারা হরতাল দিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা অচল করে দেয়ার পায়তারা করে, এদেশের মানুষ দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাদের প্রতিহত করে শুরু হয় এক নতুন দিনের সূচনা যেখানে শুধু প্রাপ্তি আর প্রাপ্তি।দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এখন পদ্মা সেতু দৃশ্যমান, তৈরি হচ্ছে রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ঢাকার বুকে সগৌরবে দাঁড়াচ্ছে মেট্রোরেল, নির্মিত হচ্ছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাথাপিছু আয় এখন ঈর্ষান্বিত, কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়নের জয়জয়কার, ক্রিড়া, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সবকিছুতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের রোল মডেল। যতদিন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি শেখ হাসিনার হাতে থাকবে দেশ পথ হারাবে না আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে।

লেখকঃ মো. ফজলুল করিম মিরাজ

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Andolon71
Theme Developed BY Rokonuddin