শুক্রবার,১৫ নভেম্বর, ২০১৯ অপরাহ্ন

'জিরো টলারেন্স' আতঙ্কে পটুয়াখালী আ'লীগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বার, ২০১৯ ২০ ১৯
  • 4880 বার পঠিত

গোফরান পলাশ-

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে পদ-পদবীর প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করা এবং আখের গোছানোর বিরুদ্ধে চলছে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' অভিযান। এই আতঙ্কে আছে দক্ষিনাঞ্চলের সমুদ্র তীরবর্তী কুয়াকাটা পর্যটন এলাকা, কলাপাড়া, মহিপুর ও পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকায় দলের নাম ভাঙ্গিয়ে চলা অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ নেতা-কর্মী এবং চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, অস্ত্রবাজ, ভূমি দস্যু, দলে অনুপ্রবেশকারী হয়ে স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত নেতাসহ দলের প্রভাবশালীদের মদদে গড়ে ওঠা একাধিক কিশোর গ্যাং গ্রুপ।

কার ওপর কখন খড়গ নেমে আসে এই ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছেন তারা। দলের ক্লিন ইমেজ রক্ষায় শুদ্ধি অভিযান সফল করতে শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে ইতোমধ্যে সারাদেশে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে নেমেছে এদের তালিকা তৈরিতে। আওয়ামী লীগ ছাড়াও যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগের ইমেজ সংকটে থাকা নেতা-কর্মীরা বাদ যাবেনা এ তালিকা থেকে এমনই বলছেন দলের একাধিক সূত্র।

দলের ইমেজ সংকটে থাকা ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুই নেতার অব্যাহতি, যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ক্যাসিনো খালেদ, টেন্ডারবাজ জিকে শামীম, আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল, কৃষকলীগ নেতা ফিরোজের আটকের পর দলের সারাদেশের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা এই অভিযানকে স্বাগত জানাচ্ছে। এছাড়া দেশবাসী সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ঘোষিত 'সন্ত্রাস, মাদক, দুর্নীতি’র বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়নে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলতে শুরু করেছে।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সূত্রে জানা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে ১১৪ পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) নির্বাচনী এলাকার মানুষ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীককে বারবার নির্বাচিত করছে। তাই সরকার প্রধান হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষিনাঞ্চলের উন্নয়নে দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রা, শের-ই-বাংলা নৌ-ঘাঁটি, কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন এলাকা, একাধিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সাবমেরিন ল্যান্ডিং ষ্টেশন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল সেতু, লেবুখালী সেতু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু, টিয়াখালী সেতু, দক্ষিনাঞ্চলে বুলেট ট্রেন সার্ভিস, বিমান বন্দর স্থাপনসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেন। দেশের তথা দক্ষিন এলাকার মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

দক্ষিনাঞ্চলের মানুষ যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের সুফল পেতে শুরু করেছে এবং আওয়ামী লীগের আদর্শে অনুপ্রানিত হয়ে দল মত নির্বিশেষে তাদের একাত্মতা প্রকাশ করতে শুরু করেছে তখন সরকার দলের নাম ভাঙ্গিয়ে এক শ্রেনীর প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, তাদের আত্মীয় স্বজন, অনুসারী নেতা-কর্মী ও ক্যাডাররা দলের নাম ভাঙ্গিয়ে আখের গোছাতে শুরু করেছে। এরা দল ও সহযোগী সংগঠনে ব্যক্তি স্বার্থে জাপা-বিএনপি-জামাত থেকে অনুপ্রবেশকারী হাইব্রীডদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে দলে বিভাজন সৃষ্টি, দীর্ঘদিনের পরীক্ষীত ত্যাগী নেতা-কর্মীদের নির্যাতন সহ কোনঠাসা করে রেখে এসব অসৎ ও দুর্নীতিবাজ নেতা-কর্মী দলের ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে।

এরা টেন্ডারবাজি, স্লুইজ গেট নিয়ন্ত্রন নিয়ে কৃষকের স্বার্থ ভুলুন্ঠিত করে নদী-খাল ও জলাশয় দখল করে মাছ চাষ, জোরপূর্বক অন্যের জমিসহ ১নং খাস খতিয়ানের জমি দখল করে ইটভাটা নির্মান, শালিশ বনিজ্য, মহাসড়কসহ বাস ষ্ট্যান্ড, টেম্পু ষ্ট্যান্ড, মোটর সাইকেল ষ্ট্যান্ড, রিকশা ষ্ট্যান্ড, খেয়াঘাট, মৎস্যবন্দর, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা ও পায়রা সমুদ্র বন্দর এলাকায় চাঁদাবাজি করে রাতারাতি অঢেল বিত্ত বৈভবের মালিক বনে গেছেন। দলের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব আখের গোছানোদের নামের তালিকা দলের তৃনমূলের নেতা-কর্মী সহ সাধারন মানুষের মুখে শোনা যাচ্ছে।

এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো: মাহবুবুর রহমান, তার কাজিন ইউসুফ আলী, বোন জামাই (জামাতের রোকন সদস্য) মজিবর, ভাগ্নে রুহুল আমিন, ভাগ্নে জামাই আবু সালেহ, সালেহ’র ছোট ভাই ইউসুফ ও বোন জামাই অধ্যক্ষ আবু সাইদ, নাতি জামাই প্রভাষক লাল বাচ্চু, ভাই ঝি জামাই কবির, মাহবুব অনুসারী ধূলাসার আওয়ামী লীগ নেতা জলিল মাষ্টার, ভূমি দস্যু রিপন, জামাল মেম্বর, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি (সাবেক জাপা নেতা) ফিরোজ সিকদার, মহিপুর থানার স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি হারুন তালুকদার, রাঙ্গাবালী যুবলীগ সভাপতি হুমায়ুন তালুকদার, কলাপাড়া শহর যুবলীগ সভাপতি জাকি হাসান জুকু, তার ছোট ভাই শহর ছাত্রলীগ সভাপতি খায়রুল হাসনাত খালিদ, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি মাহমুদুল হাসান সুজন মোল্লা, তার মেজ ভাই জামাল মোল্লা, ছোট ভাই সোহাগ মোল্লা, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পরিচালক প্রভাষক ইউসুফ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মাহবুবের এপিএস শামিম আল সাইফুল সোহাগ, পিও স্বজল, শামিমুজ্জামান কাশেম, মাহবুবের হাত ধরে দলে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে রয়েছে মাওলানা হাবিবুর রহমান, কুদ্দুস সার্ভেয়ার, নিজাম ঠিকাদার, বাচ্চু গাজী হ বেশ ক’জন অনুপ্রবেশকারী। 

এমনকি দুদকের মামলায় স্বস্ত্রীক চার্জশীটভুক্ত আসামি মাহবুব তার অনুসারী ও অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে মূল দল ও সহযোগী সংগঠনের উপজেলা থেকে তৃনমূল পর্যন্ত কমিটি গঠন করেন, যা এখনও বহাল আছে। এতে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী বাদ পড়লেও দলের সহযোগী সংগঠনের গুরুত্ব পূর্ন পদ লাভ করে বঙ্গবন্ধুর খুনী মহিউদ্দীনের ভ্রাতুস্পুত্র নাইমুল ইসলাম নাহিদের মত দুর্ধর্ষ ক্যাডাররা। মূল দলের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ অনেক নেতকর্মী তার হাতে রক্তাক্ত জখম হলেও অদ্যবধি গ্রেফতার হয়নি নাহিদসহ তার সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যরা।

দলীয় সূত্রটি আরও জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও দলের কতিপয় প্রভাবশালী নেতা শত শত মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে আতঙ্কিত করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহর থেকে তৃনমূলের প্রত্যন্ত অঞ্চল।

দলে ফের অনুপ্রবেশ ঘটেছে আনোয়ার হাওলাদার, বাচ্চু মীরা, মকবুল দফাদার, প্রভাষক শাহালম, টেনু মৃধা, দেলোয়ার মেম্বর, মাসুদ নিজামীদের। স্থানীয় সাধারন মানুষ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে এদের জনপ্রিয়তা না থাকলেও এরা অলৌকিকভাবে দিন দিন আরও প্রভাবশালী নেতা হয়ে উঠছে।

এছাড়া চাঁদাবাজি এখন নতুন মাত্রা পেয়ে ছড়িয়ে পড়েছে উপকূলের আতাখালি খাল গোড়া থেকে বঙ্গোপসাগরের হাইরের চর পর্যন্ত ২০/৩০ কি.মি. জলসীমা জুড়ে। নেতা-কর্মীদের ক্লাব ঘর ও অফিস নির্মানের নামে অস্ত্র উচিঁয়ে সহস্রাধিক জেলের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হলেও ভুক্তভোগী জেলেদের কাউকে না বলতে হুমকি দিয়েছে এক ক্ষমতাধর প্রভাবশালী নেতার অনুসারী ক্যাডাররা।

সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কবলে পড়ে সাধারন মানুষ এখন অতিষ্ঠ। কলাপাড়ায় সাধারন মানুষের মাঝে স্বস্তি ফেরেনি দুস্থদের জন্য দেয়া সরকারী চালসহ সম্প্রতি আটক আওয়ামী লীগের দুই জনপ্রতিনিধি, টিয়াখালী এলাকার শীর্ষ চাঁদাবাজ কালা মিরাজ, দেশীয় অস্ত্রসহ যুবলীগ ক্যাডার জাকারিয়া প্যাদা এবং ওয়ান শুটার গান, পিস্তল, ১২ রাউন্ড গুলি ও ৩৯০ পিচ ইয়াবাসহ মহিপুর থানা শ্রমিকলীগ সম্পাদক শাকিল মৃধার গ্রেফতার হওয়ার খবরে। কেননা অস্ত্র উঁচিয়ে চলা প্রভাবশালী কয়েক নেতার ক্যাডাররা এখনও কেউই গ্রেফতার হয়নি।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, দলের যত বড় নেতাই হোক না কেন, অপকর্ম করলে কেউ ছাড় পাবে না। তিনি বলেন, যেসব নেতার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেছে, তারা কেউই ছাড় পাবে না। অনেকের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিকভাবেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, নেতাকর্মীদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সেল রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনও প্রধানমন্ত্রীর কাছে রয়েছে।

এদিকে সরকারের হাই কমান্ডের নির্দেশে অপরাধী ও দুর্নীতিবাজ নেতা এবং গডফাদার শনাক্তে নতুন করে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। দলের ইমেজ রক্ষায় শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার লক্ষে তালিকা তৈরী করা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পদ পদবী ব্যবহারসহ দলের নাম ভাঙ্গিয়ে চলা নেতা-কর্মী, ক্যাডার ও দলে অনুপ্রবেশকারীদের।

আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় দলের জাতীয় কাউন্সিলের আগ পর্যন্ত দলের আখের গোছানোদের বিরুদ্ধে চলবে 'জিরো টলারেন্স' অভিযান। এতে দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের অকুণ্ঠ সমর্থনের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের সমর্থনসহ অকুণ্ঠ সমর্থন রয়েছে দেশবাসীর।

তাই কলাপাড়ার সাধারন মানুষও এখন অপেক্ষায় আছে শুদ্ধি অভিযানকে স্বাগত জানানোর। অপেক্ষায় আছে দলের অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ, জুয়াড়ী, সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু, মাদক কানেকশনে থাকা নেতা-কর্মী, ক্যাডার, দলের নাম ভাঙ্গিয়ে রাতা রাতি কোটিপতি বনে যাওয়া ব্যক্তিসহ দলে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে এ্যাকশনে যাওয়ার খবর শোনার।

আন্দোলন৭১/এস

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Rokonuddin
Theme Developed BY Rokonuddin