বৃহস্পতিবার,১৪ নভেম্বর, ২০১৯ অপরাহ্ন

থাকতেন গ্যারেজে, ৪ বছরে ডুপ্লক্সের মালিক রাজীব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২০ অক্টোবার, ২০১৯ ০০ ৪৭
  • 139 বার পঠিত

বিশেষ প্রতিনিধি-

কাউন্সিলর। সমাজ সেবক। সমাজের উন্নয়ন কর্মকান্ডের বাহক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। দুর্নীতির সঙ্গে আপস নয়। জনগণের সেবাই। এসব কিছু হওয়া উচিৎ। তবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির কয়েকজন কাউন্সিরের কাছে এই পদ মানে টাকা বানানোর মেশিন। তেমন একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড (মোহাম্মদপুর) কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব।

মাত্র ৫ বছরে বদলে জীবন। বাবা ও ভাইয়েরা করতেন রাজমিস্ত্রির কাজ। তিনি থাকতেন একটি বাড়ির গ্যারেজের কর্ণারে ছোট্ট একটি রুমে। সেখান থেকে মাত্র ৪ বছরে বানিয়ে ফেলেন বাড়ি-গাড়ি। বানান কোটি কোটি টাকা।

স্থানীয়রা বলেন, কাউন্সিলর হওয়ার পরপরই সম্পূর্ণ বদলে যান রাজীব। তার চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

আরও- কাউন্সিলর রাজীব আটক

রাজমিস্ত্রির ছেলে থেকে যেভাবে নবাব হয়ে যান রাজীব

কেউ হঠাৎ দেখলে ভাববেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সুলতান। কোথাও গেলে সঙ্গে থাকে গাড়ি। থাকে বিশাল মোটরবাইকের বহর। রাস্তা বন্ধ করে চলে এসব গাড়ি। রোদে গেলে আশেপাশের কেউ ধরে রাখে ছাতা। সঙ্গে ক্যাডার বাহিনী তো আছেই। মাত্র ৪ বছরে মালিক বনে গেছেন অঢেল সম্পত্তি, গাড়ি আর বাড়ির। ইচ্ছে হলেই বদলান গাড়ি। রয়েছে মোটা অঙ্কের ব্যাংক ব্যালেন্স। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দিয়েছেন বাড়ি-গাড়ি।

এই কাউন্সিলর নিজের এলাকায় গড়ে তুলেছেন রাজত্ব। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ আর মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত করেছেন তার সাম্রাজ্য। মোহাম্মদপুরের বসিলা, ওয়াশপুর, কাটাসুর, গ্রাফিক্স আর্টস ও শারীরিক শিক্ষা কলেজ, মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটি এবং বাঁশবাড়ী এলাকায় তৈরি করেছেন একক আধিপত্য।

২০১৫ সালের কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। বিভিন্ন কারসাজি করে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারান।

জানা যায়, মোহাম্মদপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতি দিয়েই শুরু হয় রাজীবের রাজনৈতিক জীবন। অল্পদিনেই নেতাদের সান্নিধ্যে এসে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ বাগিয়ে নেন। এই পদ পেয়েই থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জুতা পিটা করেন। সে সময় যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কারও করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, তারেকুজ্জামান রাজীব মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে উল্টো ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বনে যান। কেন্দ্রীয় যুবলীগের আলোচিত দপ্তর সম্পাদক আনিসুর রহমানকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে এ পদ কেনেন রাজীব। যুবলীগের সাইনবোর্ড আর কাউন্সিলরের পদটি ব্যবহার করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, ডিশ ব্যবসাসহ নানা মাধ্যমে হয়ে উঠেন আরো দুর্ধর্ষ ও বেপরোয়া।

বিগত ৪ বছরে ৮-১০টির বেশি নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি কিনেছেন রাজীব। যার মধ্যে মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কার রয়েছে।

গুলশান, মোহাম্মদপুরে তার সাত/আটটি ফ্ল্যাট কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে। 

বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফুটপাথই তার চাঁদা তোলার মূল উৎস। মোহাম্মদপুর এলাকার ফুটপাথগুলো থেকে প্রায় কোটি টাকা চাঁদা আসে তার পকেটে। তার ওয়ার্ডে সব ধরনের টেন্ডার থেকে তাকে দিতে হয় নির্দিষ্ট পার্সেন্টিজ।

অভিযোগ রয়েছে, রাজীব মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নং রোড এলাকায় পানির পাম্পের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বাড়ি বানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আর্কিটেক্ট দিয়ে ডিজাইন করে অত্যাধুনিক ফিটিংস দিয়ে রাজপ্রাসাদের আদলে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি বানান তিনি। শুধুমাত্র বাড়ির জায়গাটির দাম প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। বাড়িটি তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে আরো দুই কোটি টাকা।

এ ছাড়াও মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম, দুবাইতে বুর্জ খলিফার পাশে একটি বাড়ি এবং সৌদি প্রবাসী মিজান নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে হোটেল ব্যবসায় অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন বলে আলোচনা রয়েছে তার এলাকায়।

কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ যুবলীগ নেতা আশিকুর রহমান রনি (ভাঙ্গাড়ি রনি) চার রাস্তার মোড় ময়ূরী ভিলার পাশে সিটি করপোরেশনের পাবলিক টয়লেটের পাশে সরকারি জায়গা দখল করে চারটি পাকা দোকান এবং একটি অফিস করে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের জন্য যাদের জমি সরকার নিয়েছে তাদের জন্য আলাদা বরাদ্দকৃত জায়গাটিও দখল করে ট্রাক ও বাস রাখার জন্য ভাড়া দিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে প্রতিটি বাস ও ট্রাক থেকে অগ্রিম লাখখানেক টাকা নিয়েছেন কাউন্সিলরের লোকজন।

অভিযোগ পাওয়া যায়, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানে ৫ নম্বর রোডে ৫ নম্বর প্লটের ব্লক ডি- এর মন্টু মিয়া নামের একজনের প্লট দখল করে মহিউদ্দিন নামে একজনের কাছে বিক্রয় করে হস্তান্তর করেন। জানা যায়, বাড়িটির সামনে প্রথমে একটি গেইট ছিল এবং মন্টু মিয়ার নামে একটি সাইনবোর্ড ছিল। পরে কমিশনার কর্তৃক এই জায়গাটি দখল করা হয়। 

 এদিকে সাত মসজিদ হাউজিং ব্লক সি রোড-১ এর পশ্চিমের মাথায় খালের জমি দখল করে দু’তলা বাড়ি করে তার চাচাতো ভাই বাবুকে উপহার দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা রিয়েল এস্টেটের তিন নম্বর রোডের একটি বাড়ি দখলে আছে তার। এদিকে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধের পাশে সাত মসজিদ হাউজিংয়ে আমেরিকা প্রবাসী নজরুল ইসলামের তিন কাঠার ১টি প্লট দখল করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

 একই হাউজিংয়ে গিয়াস উদ্দিন নামে অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তার আড়াই কাঠা জমি দখল করার অভিযোগ আছে তার লোকজনের বিরুদ্ধে।

এদিকে আধিপত্য বজায় রাখতে মোহাম্মদীয়া হাউজিংয়ের কাঁচাবাজারের নির্বাচিত সভাপতি আবুল হোসেনকে দীর্ঘদিন ধরে বাজারে প্রবেশ করতে দেয় না কাউন্সিলরের লোকজন। শুধু তাই নয় কাটাসুর বাজার দখল করে উন্নয়নের নামে প্রতিটি দোকান থেকে লাখ টাকা করে নিয়েছেন তিনি। কিন্তু উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি এখনো পর্যন্ত। প্রতিটি কোরবানি ঈদের সময় মোহাম্মদপুরের তিনটি হাট সবসময়ই থাকে তার নিয়ন্ত্রণে। 

অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদপুরে যুবলীগ কর্মী তছির উদ্দিনের হত্যা মামলার আসামিরা কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের ঘনিষ্ঠ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের জেরে তছিরকে খুন করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো জাকির, হাসান, সোলেমান, ফিরোজ এবং শাহীন। স্থানীয়রা জানায়, এলাকায় মাদক ব্যবসা, ডিশ ব্যবসা, গরুর হাটের নিয়ন্ত্রণ, খাল ভরাট করে দোকান নির্মাণ ও খাসজমি দখলকে কেন্দ্র করে রাজীব এবং কাইল্যা সুমনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। কাইল্যা সুমনের গ্রুপে কাজ করতো তছিরসহ কয়েকজন।

এদিকে শনিবার (১৯ অক্টোবর) রাত ১১টার পর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার চার নম্বর সড়কের ৪০৪ নম্বর বাড়ি থেকে রাজীবকে আটক করে র‍্যাব।

রাজীব ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক।

আন্দোলন৭১/এস

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Rokonuddin
Theme Developed BY Rokonuddin