বৃহস্পতিবার,১৪ নভেম্বর, ২০১৯ অপরাহ্ন

রুপালী গিটার এবং একটি নক্ষত্রের গল্প

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৮ অক্টোবার, ২০১৯ ১৯ ১৩
  • 94 বার পঠিত

আশরাফি দিবা- 

১৯৭৫ সালের কথা। পরিক্ষায় ভালো ফল করায় ভালোবেসে কিশোর রবিনের হাতে একটি কালো গিটার তুলে দিয়েছিলেন তার বাবা। বাবার দেওয়া কালো রঙের সেই অ্যাকুয়েস্টিক গিটারেই প্রথম টুংটাং ছোঁয়া পড়ে তার আঙুলের। সেই থেকেই শুরু। ফুটবল কিংবা ক্রিকেটে নয়,  গান আর গিটারের তারের টুংটাংয়েই সবসময় মেতে থাকতেন রবিন।

সেই সময় চট্টগ্রাম নগরীর জুবলী রোড এলাকা ছিল গান পাগল কিছু তরুণের ডেরা। সেই তরুণদের দলে রবিনও ছিলেন। তখনকার সময়ে  বিশ্বের অন্যতম সেরা গিটারবাদক জিমি হ্যানড্রিকস, রিচি ব্রাকমোর, কার্লোস স্যানটানা, অন্যদিকে দেশের পপশিল্পী আজম খানের গিটারবাদক নয়ন মুন্সীর গিটারের পারদর্শিতা মুগ্ধ করেছিল তরুণ রবিনকে। মনে মনে ভেবেছিলেন ওদের মতো তাকেও গিটারে পারদর্শী হতে হবে। 

তবে স্বপ্নপূরণের পথ এত সহজ নয়। স্বপ্নকে বাস্তবতার রূপ দিতে অতিক্রম করতে হয় অনেক বাঁধা বিপত্তি। রবিনকেও সে সময় পার করতে হয়েছে অনেক বৈরী  সময়। সেসময় সরাসরি কারও শিষ্যত্ব পায়নি রবিন। চট্টগ্রামের রউফ চৌধুরী, বন্ধু নওশাদ ও সাজুর সহায়তায় তখন গিটার বাজাতে শুরু করে সে। গিটার বাজিয়ে জীবনে তার প্রথম উপার্জন ছিল ৩০ টাকা।

স্কুল জীবন শেষ করে কলেজে পড়ার সময় বন্ধুদের নিয়ে একটা ব্যান্ডদল গঠন করেন। প্রথমে তার নাম দেন গোল্ডেন বয়েজ’, দিলেও পরে পরিবর্তন রাখা হয় ‘আগলি বয়েজ’।বিয়েবাড়ি, জন্মদিন আর ছোটখাট নানা অনুষ্ঠানে এ ব্যান্ডদল নিয়ে গান করতেন তিনি। চট্টগ্রামের অলিগলিতে রাতের পর রাত গিটার হাতে বেড়িয়েছেন তিনি। কাঁধে গিটার নিয়ে বিয়ে বাড়িতে হাজির হয়েছেন। গিটার বাজিয়েছেন। তবে এ ব্যান্ডদল বেশিদিন স্থায়ী হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরা যে যার মতো ছুটে গেল। কিন্তু হাল ছাড়ল না রবিন। 

এরপর ১৯৭৭-৭৮ সালের দিকে ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের হয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে গান শুরু করেন তিনি। তবে ওই সময়  চট্টগ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ‘সোলস’।  ১৯৭৮ সালের শেষ দিকে সোলস-এ যোগ দেন তিনি। যাত্রা শুরু হয় বাংলার সর্বকালের সেরা একটি ব্যান্ড দলের। বাংলার আধুনিক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের আকাশে স্বমহিমায় ঠাঁই করে নেয় এক নতুন নক্ষত্র তরুণ তুর্কি রবিন অরূপে আইয়ুব বাচ্চু। তিনি ছিলেন একাধারে ব্যান্ডের গিটারিস্ট, ভোকাল, গীতিকার ও সুরকার।

১৯৮৩ সালের এক বিকেলে মাত্র ৬০০ টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। উঠেছিলেন এলিফ্যান্ট রোডের এক হোটেলে। নিঃসঙ্গ সেই হোটেলবাসী বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী তারকা হয়ে উঠলেন প্রতিভা আর কঠোর পরিশ্রমে।

১৯৯১ সালের কথা।  ‘সোলস’ এর গিটারিস্ট সুহাসের চট্টগ্রাম হিল বর্তমান ফরেস্ট কলোনির এলাকার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সবাই।আইয়ুব বাচ্চু যেখানেই ঘুরে বেড়াতে যেতেন সঙ্গে থাকতো গিটার। হঠাৎ তিনি গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গিকে প্রস্তাব দেন এই সুন্দর পরিবেশে কোনো গান্ম তোলার জন্য। সানন্দে রাজি হন  শহীদ মাহমুদ জঙ্গি। লিখেন, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে/মায়াবী সন্ধ্যায় চাঁদজাগা একরাতে/একটি কিশোর ছেলে, একাকী স্বপ্ন দেখে/হাসি আর গানে সুখের ছবি আঁকে/আহা কি যে সুখ।’

গানের এই কিশোর ছেলেটির মতো আইয়ুব বাচ্চুও এক অজানা স্বপ্নের পেছনে। নিজের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের ব্যান্ড দল ‘ইয়োলো রিভার ব্যান্ড’ বা এল আর বি ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় ‘এল আর বি’ প্রথম ব্যান্ড অ্যালবাম ‘এল আর বি’। এটি বাংলাদেশের প্রথম দ্বৈত অ্যালবাম। এ অ্যালবামের ‘শেষ চিঠি কেমন এমন চিঠি’, ‘ঘুম ভাঙা শহরে’, ‘হকার’ গানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৯৩ ও ৯৪ সালে তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যান্ড অ্যালবাম ‘সুখ’ এবং ‘তবুও’ বের হয়।

১৯৯৫ সালে বের হয় আইয়ুব বাচ্চুর সর্বকালের সেরা একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’। এ অ্যালবামের ‘কষ্ট কাকে বলে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘অবাক হৃদয়’, ও ‘আমিও মানুষ’ গানগুলো তুমুল জনপ্রিতা পায়। ২০০৮ সালে সর্বশেষ অ্যালবাম ‘স্পর্শ’ প্রকাশিত হয়।

২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবরের সন্ধ্যা। মঞ্চে ওঠেন আইয়ুব বাচ্চু। গেয়ে ওঠেন ‘আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেব আকাশে’। গানের কথাই যেন সত্যি হলো, মাত্র এক দিনের ব্যবধানে রুপালী গিটার ফেলে, আকাশে উড়াল দিয়ে চলে গেলেন দূরে, বহুদূরে।  

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন,  এ শহরে আমার মা ঘুমিয়ে আছেন। এ শহরেই আমি আবারও ফিরে আসব।’ তার ইচ্ছানুযায়ী ২০ অক্টোবর বিকেলে চট্টগ্রামের বাইশ মহল্লা চৈতন্য গলি কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করা হয় এই গানের জাদুকরকে। 

আইয়ুব বাচ্চুর হারিয়ে যাওয়ার এক বছর আজ। যে গিটারের ঝনাৎকারে বিদ্যুৎ বয়ে যেত তরুণ-তরুণীদের শিরা-উপশিরায় সেই গিটার আজও আছে, আছে সেই গিটারের ছয়টি তার। কিন্তু  স্তব্ধ আজ চিরতরুণ গানের মানুষটির কণ্ঠ। তবে কিছু মানুষ হারিয়ে যেয়েও রয়ে যায় মানুষের অন্তরে। আইয়ুব বাচ্চুও তেমনই একজন। আজ হয়ত তিনি নেই, কিন্তু আজও সবার মনে বেজে ওঠে রুপালী গিটারের সেই তার গুলো। 

আন্দোলন৭১/এডি 

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..
© All rights reserved © 2018 Rokonuddin
Theme Developed BY Rokonuddin